“বাবা অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন…মানুষকে সাহায্য করেও প্রচার করতেন না, সিস্টেমের বাস্তবতাই ওনাকে প্রভাবিত করেছিল” “মাখন লাগাতে পারি না, তাই কাজও নেই” ইন্ডাস্ট্রি থেকে বঞ্চিত, তাপস পালের মৃ’ত্যুর ছয় বছর পর বি’স্ফোরক কন্যা সোহিনী পাল! বাবার জীবনে রাজনীতির প্রভাব নিয়ে কোন তথ্য আনলেন সামনে?

সোহিনী পাল (Sohini Paul) বাংলা সিনেমার পরিচিত মুখ, যিনি অভিনয়জগতে নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছেন ধীরে ধীরে। কিংবদন্তি অভিনেতা ও প্রাক্তন সাংসদ তাপস পালের কন্যা হিসেবেই প্রথম পরিচিতি পেলেও, নিজের অভিনয়ের দক্ষতায় দর্শকদের নজর কাড়েন তিনি। কৌশিক গাঙ্গুলির জ্যাকপটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ছবিতে কাজ করার পাশাপাশি বলিউডেও নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করেছেন সোহিনী। সম্প্রতি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে বাবার স্মৃতি, নিজের অভিনয়জীবনের লড়াই, মুম্বইয়ের অভিজ্ঞতা এবং ইন্ডাস্ট্রির নেপথ্যের বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। সেই কথাতেই উঠে আসে বহু অজানা অধ্যায়।

সোহিনীর কথায়, ছোটবেলা থেকেই তাঁর বাবা তাঁকে নিজের ইচ্ছেমতো জীবন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। কখনও জোর করে অভিনয়ে আনতে চাননি, আবার পড়াশোনার ক্ষেত্রেও নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দিয়েছেন। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পরে কমার্স নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্তকে আজও নিজের ভুল বলে মনে করেন সোহিনী। তবে বাবা সবসময় পাশে থেকেছেন। এমনকি স্কুলের স্পোর্টস ডে বা প্যারেন্টস-টিচার্স মিটিংয়েও ব্যস্ত শুটিংয়ের ফাঁকে হাজির হতেন তাপস পাল। সোহিনী বলেন, বাবা কখনও সুপারস্টারের অহংকার নিয়ে ঘরে ফিরতেন না, তিনি শুধু ‘বাবা’ই ছিলেন। আর নিজের ব্যক্তিত্ব নিয়ে বলতে গিয়ে সোহিনী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি মাখন খেতে ভালোবাসি, লাগাতে নয়”

আরও পড়ুনঃ “ধ’র্ষণের হুম’কি, বৃদ্ধা মাকেও রেহাই দেয়নি” “এই রাজ্যটিকে কি আপনারা উত্তরপ্রদেশ, মণিপুর বা গুজরাট বানাতে চাইছেন?” দ্বিতীয় দফার প্রাক্কালে, বিজেপিকে তুলোধোনা! নাম না করে প্রধানমন্ত্রীকেও তীব্র কটাক্ষ রূপাঞ্জনা মিত্রের!

অর্থাৎ কাজ পাওয়ার জন্য তোষামোদ বা কৃত্রিম সম্পর্ক তৈরির পথে তিনি কখনও হাঁটতে পারেননি। কলেজ শেষ করার পরই অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সোহিনী। তারপর মুম্বইয়ে পাড়ি দেন নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে। সেখানে গিয়ে তিনি একেবারে নিজের পরিচয়ে লড়েছেন, তাপস পালের মেয়ে পরিচয়কে সামনে আনেননি। প্রতিদিন ব্যাগে কয়েক সেট জামাকাপড় নিয়ে অডিশনে ছুটতেন, পরবর্তী সময়ে তিনি কাজও পেয়েছেন শুধুমাত্র অডিশনের ভিত্তিতে। পাশাপাশি একটি ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থায় বুকিং হেড হিসেবেও কাজ করেছেন। সোহিনীর কথায়, মুম্বইয়ে কেউ তাঁকে ‘তাপস পালের মেয়ে’ হিসেবে চিনত না, আর সেটাই ছিল তাঁর নিজের পরিচয় গড়ার লড়াই।

তবে তিনি স্বীকার করেন, ইন্ডাস্ট্রিতে নেটওয়ার্কিং একটা বড় স্কিল, যা তাঁর মধ্যে ছিল না। এই সাক্ষাৎকারে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহল নিয়ে এক বিতর্কিত দিকও তুলে ধরেছেন সোহিনী। তাঁর কথায়, বহু সময় সম্পর্ক বা পরিচিতি থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনও কাজ চাননি। কারণ তাঁর বিশ্বাস, শুধুমাত্র কারও মেয়ে হওয়ার কারণে কাজ পাওয়া উচিত নয়। যদিও অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, তাপস পালের মতো জনপ্রিয় অভিনেতার সহকর্মীরা কেন তাঁকে কাজের সুযোগ করে দিলেন না? কিন্তু সোহিনীর জবাব স্পষ্ট, এ নিয়ে তাঁর কোনও অভিমান নেই। বরং তিনি মনে করেন, যদি তিনি সত্যিই কিছু অর্জন করতে চান, তা হলে নিজের যোগ্যতাতেই তা করতে হবে।

এই মন্তব্য ইন্ডাস্ট্রির তথাকথিত ‘লবি কালচার’ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বাবার মৃত্যু প্রসঙ্গেও আবেগঘন এবং কিছুটা বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সোহিনী। তাঁর দাবি, হাসপাতালে চিকিৎসার সময় গাফিলতির কারণেই তাপস পালের অবস্থার অবনতি হয়েছিল। ডায়ালিসিসের সময় ভুলভাবে একটি ভেন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হয়, যা সময়মতো ধরা পড়েনি। সোহিনীর অভিযোগ, এই অবহেলাই শেষ পর্যন্ত তাঁর বাবার মৃত্যুর অন্যতম কারণ। যদিও সেই সময় প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল, এখন তিনি বিষয়টাকে ভাগ্যের অংশ হিসেবেই দেখেন। তবে এই অভিযোগ ফের একবার চিকিৎসা ব্যবস্থার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রাজনীতি নিয়েও বাবাকে ঘিরে এক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন সোহিনী।

তাঁর দাবি, বাবা অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন এবং সেই কারণেই অনেক সময় রাজনীতির কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং অনেক সময় সিস্টেমের বাস্তবতা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। সোহিনী মনে করেন, রাজনীতিতে ভালো মানুষের আরও বেশি প্রয়োজন। একইসঙ্গে বাবার মানবিক দিক নিয়েও কথা বলেন তিনি, তাপস পাল নাকি বহু মানুষকে সাহায্য করলেও কখনও তা প্রচার করতেন না। “আমার বাঁ হাত জানবে না, ডান হাত কী করছে” বাবার এই নীতিকেই নিজের জীবনের শিক্ষাও বলে মানেন সোহিনী। সাক্ষাৎকারের শেষে তাঁর কথাতেই পরিষ্কার, তাপস পালের কন্যা হিসেবে নয়, নিজের শর্তে নিজের মতো করে জীবন ও কেরিয়ার গড়ে তুলতেই তিনি এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

You cannot copy content of this page