সাত মাস ধরে ভাঙা দুই পা নিয়েই চলছে লড়াই! ২৪ ফুট উঁচু থেকে পড়ে গুরুতর জ’খম লাইটম্যান সুকান্ত! কীভাবে চলছে তাঁর সংসার? পাশে কি দাঁড়ালেন ইন্ডাস্ট্রির কেউ? টলিউডের ঝলমলে আলোর আড়ালে শিল্পীদের জীবনের দাম এতটাই কম? নিরাপত্তাহীনতায় যাবে আর কত প্রাণ? রাহুলের মৃ’ত্যুর পরেও উঠছে প্রশ্ন!

বিনোদন জগতের ঝলমলে আলোয় আমরা সাধারণত যাদের দেখি তারা হলেন অভিনেতা-অভিনেত্রী অর্থাৎ ক্যামেরার সামনে থাকা মানুষজন। তাঁদের সাফল্য, কষ্ট, সংগ্রাম নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। কিন্তু এই আলো ঝলমলে দুনিয়ার আড়ালে যারা নিরলস পরিশ্রম করে পুরো শুটিং সেটকে দাঁড় করিয়ে রাখেন, সেই টেকনিশিয়ানদের গল্প খুব কমই সামনে আসে। বিশেষ করে লাইটম্যানদের মতো কর্মীদের জীবনযাপন, ঝুঁকি আর সংগ্রাম অনেকটাই অজানা থেকে যায় সাধারণ মানুষের কাছে। এমনই এক বাস্তব এবং হৃদয়বিদারক গল্প উঠে এসেছে লাইটম্যান সুকান্তর জীবনে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার মাধ্যমে।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে উত্তর কলকাতার ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি এলাকায় একটি বিজ্ঞাপনের শুটিং চলাকালীন ঘটে যায় মারাত্মক দুর্ঘটনা। শুটিং সেটে প্রায় ২৪ ফুট উঁচু একটি লাইট বসানোর কাজ চলছিল। হঠাৎ একটি কেবল থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করলে আগুন লাগার আশঙ্কায় দ্রুত সেটি সরানোর জন্য তৎপরতা শুরু হয়। সেই সময় নিচে থাকা সুকান্ত তাড়াহুড়ো করে উপরে উঠতে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মইটি ঠিকভাবে বাঁধা ছিল না বা সঠিকভাবে স্থাপন করা হয়নি। উপরে উঠতে গিয়েই হঠাৎ সেটি ভেঙে যায়, আর সুকান্ত সোজা ২৪ ফুট নিচে মাটিতে পড়ে যান।

এই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় সুকান্ত গুরুতরভাবে আহত হন। তাঁর মাথায় চোট লাগে এবং দুই পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ডান পায়ে পাঁচটি এবং বাঁ পায়ে চারটি ফ্র্যাকচার ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে কলকাতার পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমে ১০ দিন প্লাস্টার করে রাখা হয় এবং পরে প্রায় চার ঘণ্টার দীর্ঘ অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর তাঁকে প্রায় ৩০ দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়। চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাঁর পায়ে প্লেট ও স্ক্রু বসানো হয়েছে, যা এখনো খোলা হয়নি।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শুরু হয় দীর্ঘ পুনর্বাসনের লড়াই। টানা ছয় মাস বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছে তাঁকে, পায়ে ভর দেওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল। বর্তমানে সাত মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন। এখন ওয়াকারের সাহায্যে ধীরে ধীরে হাঁটার চেষ্টা করছেন এবং নিয়মিত ফিজিওথেরাপি চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কবে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে কাজে ফিরতে পারবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। এমনকি তিনি আবার আগের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবেন কিনা, সেই আশঙ্কাও রয়ে গেছে।

এই কঠিন সময়ে সুকান্ত একা নন, তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন সহকর্মীরা। ম্যানেজার গিল্ড, সাউন্ড গিল্ড, অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যামেরা গিল্ড এবং লাইটম্যান ইউনিয়নের সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করেছেন। কেউ ২০০ টাকা, কেউ ৫০০ টাকা এইভাবে ছোট ছোট অনুদান মিলিয়ে বড় সহায়তা গড়ে উঠেছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, প্রোডাকশন টিমের দুই ব্যক্তি পৃথা এবং সায়ন্তনের নাম তিনি উল্লেখ করেছেন যারা তাঁকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০,০০০ টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন। এই সহায়তাতেই এতদিন তাঁর চিকিৎসা ও সংসার কোনওভাবে চলেছে।

আরও পড়ুন: “মাতব্বরি করতে গেলেই সৃষ্টি নষ্ট…ক্ষ’তবিক্ষ’ত হলে খুব কষ্ট হয়” দাবি বর্ষীয়ান অভিনেতার! সিনিয়র তকমা লাগিয়ে বহু শিল্পী প্রজন্মের ভেদাভেদের সৃষ্টি করে নিন্দা করেন! সেখানে অভিজ্ঞতার অহং নয়, তরুণদের সঙ্গে সমান তালে মিশতেই কেন বিশ্বাসী পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়?

তবে সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। দীর্ঘদিন কাজ করতে না পারায় সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে। সুকান্ত জানিয়েছেন, তিনি একজন ভালো অর্থোপেডিক ডাক্তারের পরামর্শ নিতে চান, যাতে দ্রুত সুস্থ হয়ে কাজে ফিরতে পারেন। কিন্তু উন্নত চিকিৎসার খরচ বহন করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তিনি সকলের কাছে আবেদন জানিয়েছেন যদি কেউ তাঁর চিকিৎসার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, তবে তিনি নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পাবেন। এই ঘটনাই আবার মনে করিয়ে দেয়, বিনোদন জগতের এই পরিশ্রমী মানুষগুলোর নিরাপত্তা ও প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করা কতটা জরুরি।

You cannot copy content of this page