রথযাত্রা মানেই শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাঙালির শৈশবের অসংখ্য স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বিশেষ দিন। ছোট্ট কাঠের রথ, পাড়ার মেলা, পাঁপড়ভাজা, জিলিপি, রঙিন বেলুন আর বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠার সেই মুহূর্তগুলো আজও অনেকের মনে অমলিন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কি বদলে যাচ্ছে সেই আবেগ? নতুন প্রজন্ম কি আগের মতো আর রথ নিয়ে উৎসাহ দেখায় না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই নিজেদের ছোটবেলার স্মৃতি ভাগ করে নিলেন অভিনেতা বিশ্বনাথ বসু, অভিনেত্রী মানসী সিনহা এবং অভিনেতা খরাজ মুখোপাধ্যায়। তিনজনের কথাতেই উঠে এসেছে রথযাত্রার নানা রঙিন স্মৃতি, আবার বর্তমান প্রজন্মকে নিয়ে কিছুটা আক্ষেপও।
বিশ্বনাথ বসু জানান, তাঁদের গ্রামে রথযাত্রার দিন থেকেই দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। তাঁর কথায়, “লোকে বলে, রথ টানলে দুর্গা আসে। আমাদের গ্রামের বাড়িতে রথের দিন কাঠামো পুজো হয়। সেই কাঠই পরে মা দুর্গার চালায় ব্যবহার করা হয়।” ছোটবেলায় সকাল থেকেই বাড়িতে উৎসবের পরিবেশ থাকত। আশপাশের রথের মেলায় ঘুরতে যেতেন, আর সেই আনন্দ ছিল অন্যরকম। তিনি আরও বলেন, জীবনে তিনবার পুরীর রথযাত্রা দেখার সুযোগ হয়েছে, এমনকি প্রথমবার রথেও উঠেছিলেন। এখন কাজের ব্যস্ততায় আর যাওয়া হয় না। তবে তাঁর দুই ছেলেও এখনও রথের দিন মেলায় যেতে এবং রথ সাজাতে ভালোবাসে। তবু তাঁর মতে, “আমরা যে ভাবে রথের দিন দাপিয়ে বেড়াতাম, এখনকার দিনে তেমন উত্তেজনা বিশেষ চোখে পড়ে না।”
মানসী সিনহার ছোটবেলার রথযাত্রাও ছিল পারিবারিক আনন্দে ভরা। তিনি জানান, শ্যামবাজারের বাড়িতে মা নিজে রথ সাজিয়ে দিতেন। সেই রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে বসিয়ে বিকেলে পাড়ায় বেরিয়ে পড়তেন। তিনি বলেন, “আমি রথের পিছনে কাঁসর বাজাতে বাজাতে যেতাম। ১০ পয়সা, ২০ পয়সা প্রণামীও দিত লোকজন। চার আনা দিলে তাঁকে ঈশ্বর বলে মনে হতো।” রথ আর উল্টো রথ মিলিয়ে যে টাকা উঠত, তা দিয়ে মা একদিন ফুচকা বা ঘুগনি খাওয়াতেন। কিছু টাকা আবার ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখতেন বলেও তাঁর ধারণা। সেই সময়ের রথের মেলার আনন্দ আজও তাঁর মনে গেঁথে রয়েছে। তবে এখনকার প্রজন্ম সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানান, তাঁর নিজের ছেলেমেয়েরাও ছোটবেলায় খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি।
এখন কলেজে পড়ার ব্যস্ততায় রথের মেলায় যাওয়ার সময়ই মেলে না। খরাজ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতেও রথযাত্রা মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। পদ্মপুকুর এলাকায় তাঁদের বাড়ির কাছে বড় মেলা বসত। তিন ভাই মিলে রথ সাজিয়ে পাড়ায় বেরোতেন। তিনি মজার ছলে বলেন, “রথ সাজিয়ে বেরিয়ে তো পড়েছি। কিন্তু রথের চাকা তো আর এগোয় না। আর এগোলেও হেলে পড়ে যায়। বড় হওয়ার পরে বুঝেছি দোষটা আসলে কার।” বিকেলে রথ নিয়ে ঘোরা শেষে সন্ধ্যায় মেলায় গিয়ে পাঁপড় আর জিলিপি খাওয়ার আনন্দ আজও ভুলতে পারেননি তিনি। ছোটবেলায় দাদুর সঙ্গে মাহেশের রথ দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর মনে রয়েছে। যদিও তখন বয়স কম থাকায় স্মৃতি কিছুটা ঝাপসা।
আরও পড়ুনঃ নৃত্যশিল্পী থেকে নায়িকা! নাচের মঞ্চ পেরিয়ে এবার ছোট পর্দায় আত্মপ্রকাশ সম্পিতা প্রামাণিকের! কোন চ্যানেলের ধারাবাহিকে দেখা যাবে তাঁকে? বিপরীতে নায়ক হিসেবে রয়েছেন দারুণ জনপ্রিয় অভিনেতা?
কয়েক বছর আগে রথের দিন ইসকনের আমন্ত্রণে গিয়েও তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন তাদের আয়োজন দেখে। তিন শিল্পীর কথাতেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সময় বদলেছে, আর তার সঙ্গে বদলেছে উৎসব উদ্যাপনের ধরনও। বিশ্বনাথ, মানসী এবং খরাজ প্রত্যেকেই মনে করেন, বর্তমান প্রজন্মের কাছে রথযাত্রার আবেগ আগের মতো আর নেই। খরাজ বলেন, “আমার গিন্নী এখনও রথের মেলায় যায়। তবে আমার ছেলেকে দিয়ে বুঝি, এ প্রজন্মের রথ নিয়ে একেবারেই তেমন আগ্রহ নেই। কচিকাঁচাদেরও আর দেখি না পাড়ায় রথ নিয়ে বেরোতে।” যদিও তাঁদের বিশ্বাস, রথযাত্রার ঐতিহ্য কখনও হারিয়ে যাবে না। সময়ের সঙ্গে উৎসবের রূপ বদলালেও শৈশবের সেই স্মৃতিগুলো আজও তাঁদের কাছে অমূল্য সম্পদ হয়ে রয়েছে।






