বাংলা বিনোদন জগতে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নাম উচ্চারণ করলেই সামনে আসে দীর্ঘ কয়েক দশকের এক বর্ণময় অভিনয়-অধ্যায়। বাণিজ্যিক ছবি থেকে ভিন্নধারার সিনেমা বিভিন্ন সময়ে নানা চরিত্রে নিজের অভিনয় দক্ষতার ছাপ রেখেছেন তিনি। দীর্ঘ কেরিয়ারে একের পর এক সাফল্য তাঁকে টলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতার জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। আজও বাংলা ছবির দর্শকের কাছে ‘বুম্বাদা’ নামটির আলাদা আবেগ রয়েছে। তবে এই সাফল্যের নেপথ্যে যে শুধু তারকা-জীবনের ঝলমলে গল্প নেই, বরং রয়েছে কঠিন সময়, লড়াই এবং পরিবারের নানা প্রতিকূলতার গল্প সেই কথাই এবার তুলে ধরলেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী অনামিকা সাহা।
আজ যতই টলিউডের ‘রাজা’ হয়ে উঠুন প্রসেনজিৎ, তাঁর এই জায়গায় পৌঁছনোর পথ মোটেই সহজ ছিল না। অনামিকা সাহার কথায়, প্রসেনজিতের জীবনের শুরুটা ছিল অনেক সংগ্রামের। বাবা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় নিজে বিনোদন জগতের বড় নাম হলেও প্রসেনজিতের বেড়ে ওঠার সময়ে সেই পরিচয় থেকে তিনি প্রত্যাশিত সাহায্য পাননি। বরং পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে তাঁর মা রন্তা চট্টোপাধ্যায়কেই একাই ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই করতে হয়েছিল। অর্থাৎ তারকা পরিবারের সন্তান হয়েও অভিনয় জগতে নিজের জায়গা তৈরি করতে প্রসেনজিতকে পেরোতে হয়েছে কঠিন সময়।
অনামিকা সাহা জানিয়েছেন, সেই সময় প্রসেনজিতের মা বিভিন্ন প্রযোজকের কাছে গিয়ে ছেলের জন্য কাজ চাইতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সুযোগ পেলে তাঁর ছেলে নিজেকে প্রমাণ করবেই। তিনি নাকি প্রযোজকদের বলতেন, “আমার ছেলেকে নাও, ও ঠিক পারবে।” ছেলেকে নিয়ে সেই বিশ্বাসই ধীরে ধীরে বাস্তব হয়ে ওঠে। অনামিকা নিজেও একসময় রন্তা চট্টোপাধ্যায়কে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, “বুম্বা একদিন অনেক বড় হবে।” আজকের প্রসেনজিতের সাফল্যের দিকে তাকালে সেই কথারই যেন প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর মতে, প্রসেনজিতের মা জীবনে বহু কষ্ট করেছেন, আর সেই কষ্টের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে আজকের ‘বুম্বাদা’।
সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী ‘পরিবার’ সিনেমার কিছু স্মৃতিচারণ করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। অভিনেত্রী জানান একদিন নির্ধারিত সময়ের থেকে দশ মিনিট দেরিতে শুটিংয়ে পৌঁছে জানতে পারেন প্রসেনজিৎ রাগ করে বেরিয়ে গেছে। “বুম্বা চলে গেল? আমার কথা বুম্বা রাখলো না, দশ মিনিট আমাকে সময় দিল না! যেহেতু অনেক বড়ো হয়ে গেছে…” মনের মধ্যে কান্না চেপে এই সমস্ত ভাবনা নিয়ে সেদিন শুটিং এগিয়ে নিয়ে যান তিনি। সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল তবে শেষের দিকে একটি দৃশ্যে প্রসেনজিৎ তাকে মা বলে ডেকে জড়িয়ে ধরার কথা ছিল। অভিনেত্রী জানেন সেই দৃশ্য হওয়া অসম্ভব কারণ বুম্বা আগেই চলে গিয়েছে। কিন্তু তাকে চমকে দিয়ে হঠাৎ সেখানে এসে দাঁড়ান তিনি, পাশে বসে মা বলে ডাকতেই তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনামিকা!
হাততালি দিয়ে শর্ট শেষ করার পর ডাইরেক্টর জানান, আসলে বুম্বা চলে যাননি বরং এমন আবেগপ্রবণ দৃশ্যকে আরও বাস্তবসম্মত করে তোলার জন্য নাটক করেছিলেন তিনি। প্রসেনজিতের সঙ্গে অনামিকা সাহার সম্পর্কও তাই শুধুমাত্র সহ-অভিনেতার নয়। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তাঁর সঙ্গে একশোরও বেশি ছবিতে কাজ করেছেন অনামিকা। কখনও বকেছেন, আবার কখনও মায়ের মতো ভালোবেসেছেন। অভিনেত্রীর কথায়, প্রসেনজিৎ তাঁকে ডাকলে এখনও তিনি না গিয়ে থাকতে পারেন না। এত বছর পরেও তাঁদের সম্পর্কের সেই টান অটুট। শুধু প্রসেনজিৎ নন, তাঁর পরিবারের সঙ্গেও অনামিকার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। প্রসেনজিতের ছেলে ত্রিশাঞ্জিত চট্টোপাধ্যায় তাঁকে আদর করে ‘পান দিদা’ বলে ডাকে।
আরও পড়ুনঃ “সবে সবে ভোটে জিতলে গলার আওয়াজ বাড়ে, কাজ করার ক্ষমতা নেই বলেই তো ঘৃ’ণা উস্কে…” ভোটের মার্জিনের সঙ্গে চিৎকারের মার্জিনও বেড়েছে? যাদবপুর কাণ্ডে নাম না করেই শর্বরী মুখোপাধ্যায়কে তীব্র কটা’ক্ষ ঋদ্ধি সেনের! এসএফআই ও এবিভিপির সংঘর্ষে উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি, অভিনেতা কেন কাঠগড়ায় তুললেন নতুন সরকারকে?
এমনকি নিজের বাবার কোনও সিনেমা হলে সেখানে অনামিকাকে দেখার আবদারও নাকি রয়েছে তাঁর। অনামিকার চোখে প্রসেনজিৎ শুধু বড় তারকা নন, বড় মনের মানুষও। তাঁর কাছ থেকে জীবনে অনেক কিছু শেখার সুযোগ পেয়েছেন বলেও জানান তিনি। একসময় যে মায়ের বিশ্বাস, চেষ্টা এবং ছেলের প্রতিভার উপর ভর করে পথ চলা শুরু হয়েছিল, সেই পথই শেষ পর্যন্ত প্রসেনজিৎকে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত করেছে। তাই আজকের সাফল্যের পিছনে শুধু তারকার আলো নয়, লুকিয়ে রয়েছে এক মায়ের লড়াই, এক সন্তানের জেদ এবং দীর্ঘ স্ট্রাগলের গল্প যে গল্প জানলে ‘বুম্বাদা’কে হয়তো আরও একটু অন্যভাবে দেখা যায়।






