বিনোদন জগতের তারকাদের জীবনকে আমরা সাধারণত ক্যামেরার সামনের আলো, সাফল্য আর জনপ্রিয়তার মধ্যেই দেখি। কিন্তু সেই আলোর আড়ালে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনেও তৈরি হয় অন্য এক গল্প যেখানে থাকে প্রেম, অভিমান, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা এবং কখনও না-পাওয়ার যন্ত্রণা। পর্দায় যে শিল্পীরা অন্যের জীবনের গল্পকে অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেন, তাঁদের নিজেদের জীবনেও কখনও কখনও এমন কিছু অধ্যায় থাকে, যা কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম আবেগঘন নয়। বাংলা অভিনয় জগতের অন্যতম কিংবদন্তি অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের (Sabitri Chatterjee) জীবনও তেমনই নানা ওঠাপড়ায় ভরা। তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের কিছু সম্পর্ক আজও মানুষের কৌতূহলের বিষয়।
সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বাংলা সিনেমা ও নাট্যজগতের এক উজ্জ্বল নাম। দেশভাগের পর কলকাতায় এসে অভাব-অনটনের মধ্যেই তাঁর অভিনয়জীবনের শুরু। থিয়েটার থেকে সিনেমা দুই মাধ্যমেই নিজের অভিনয় প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। উত্তম কুমারের সঙ্গে একাধিক ছবিতে তাঁর জুটি দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ‘লাখ টাকা’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘কল্যাণী’, ‘রাইকামল’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘মোমের আলো’ থেকে ‘ধন্যি মেয়ে’ দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের পর্দার রসায়ন বাঙালির মনে জায়গা করে নেয়। ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও উত্তম-সাবিত্রীকে ঘিরে নানা আলোচনা হয়েছে। সাবিত্রী নিজেও পরবর্তী সময়ে উত্তম কুমারকে তাঁর প্রথম প্রেম হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু উত্তম কুমারই যে তাঁর জীবনের একমাত্র গভীর সম্পর্ক ছিলেন, গল্পটা সেখানে শেষ নয়। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় কেন বিয়ে করেননি, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্কগুলির কথাও সামনে আসে। তাঁর বক্তব্যের সূত্রে উঠে এসেছে, যাঁদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তাঁদের অনেকেই আগে থেকেই বিবাহিত ছিলেন। ফলে সেই সম্পর্কগুলিকে সামাজিকভাবে দাম্পত্যের পরিণতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। সর্বেন্দ্র সিংয়ের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ছিল একই রকম। তিনি ছিলেন একজন অভিনেতা এবং বিবাহিত। কিন্তু সম্পর্কটি সাবিত্রীর কাছে যে কতটা গভীর ছিল, তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাঁর আত্মজীবনী ‘সত্যি সাবিত্রী’-তে।
সর্বেন্দ্রর সঙ্গে সাবিত্রীর সম্পর্ক ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে সামাজিক বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা না থাকলেও অভিনেত্রী তাঁকে নিজের ‘স্বামী’ হিসেবেই মনে করতেন। ‘সত্যি সাবিত্রী’-তে তিনি লিখেছিলেন, তাঁদের সম্পর্ক বিয়ের সামাজিক নিয়মে বাঁধা না হলেও তাঁর কাছে সর্বেন্দ্র শুধু বন্ধু ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর স্বামী। সিঁথিতে সিঁদুর বা হাতে শাঁখা না থাকলেও দু’টি হৃদয়ের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটিকেই তিনি নিজের কাছে বিবাহের সমতুল্য বলে অনুভব করেছিলেন। সর্বেন্দ্রর শারীরিক অসুস্থতার সময়ও সাবিত্রী তাঁর পাশে ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেটের গুরুতর সমস্যার কারণে তাঁর মুম্বইয়ে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করেছিলেন সাবিত্রী। এমনকি তাঁর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর আশাও করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সর্বেন্দ্র তাঁর স্ত্রীকেই সঙ্গে নিয়ে মুম্বই যান।
আরও পড়ুনঃ ১৯২৫ থেকে চলে আসছে, আজও বদলায়নি নিয়ম! বৈষ্ণব মল্লিকবাড়িতে নেই বলি*প্রথা, ষষ্ঠীতে বোধনের পর আমিষ ছোঁয়া নিষেধ, তবে দশমীতে দেবীর বিদায়ের দিনে কেন হেঁশেলে ওঠে মেটে? একশো বছর পেরিয়েও সেই পারিবারিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন সদস্যরা! রঞ্জিত মল্লিক ও কোয়েল মল্লিকের বাড়ির দুর্গাপুজোর বিশেষত্ব কী কী জানেন?
এই সম্পর্কের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় আসে সর্বেন্দ্রর মৃত্যুর সময়। তাঁর শেষ সময়ে সাবিত্রীকে কাছে যেতে দেওয়া হয়নি, এমনকি ফুলের মালা পরানোর সুযোগও তিনি পাননি। ফলে যে মানুষটিকে সামাজিক স্বীকৃতি ছাড়াই মনেপ্রাণে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, তাঁর শেষযাত্রাতেও পাশে থাকতে না পারার আক্ষেপ থেকে যায়। এখানেই সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জীবনের গল্পটি আরও বেদনাময় হয়ে ওঠে। উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, সর্বেন্দ্র সিংকে ঘিরে তাঁর এই অসমাপ্ত অধ্যায়টি ততটাই আড়ালে থেকেছে। তবে তাঁর আত্মজীবনীতে নিজের অনুভূতির যে স্বীকারোক্তি তিনি রেখে গিয়েছেন, তা থেকে বোঝা যায় সাবিত্রীর কাছে এই সম্পর্ক শুধুমাত্র একটি প্রেমের গল্প ছিল না এটি ছিল তাঁর জীবনের এক গভীর, ব্যক্তিগত এবং অপূর্ণ অধ্যায়।






