বাংলা বাণিজ্যিক ছবির ইতিহাসে অঞ্জন চৌধুরী এমন এক পরিচালক, যাঁর সিনেমা একসময় দর্শকদের হলমুখী করত। পারিবারিক সম্পর্ক, ঘরোয়া টানাপোড়েন, শাশুড়ি-বউমার দ্বন্দ্ব, হাসি-কান্না এবং আবেগ, এই সবকিছুকে পর্দায় তুলে ধরেই দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ছবির গল্পের সঙ্গে নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পেতেন বহু সাধারণ মানুষ। উত্তমকুমার-পরবর্তী বাংলা সিনেমার যুগে বাণিজ্যিক ছবির জগতে নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন এই পরিচালক। তাঁর সিনেমা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে ভিড় জমত, এমনকী হলের বাইরে ঝুলত ‘হাউসফুল’ বোর্ডও। কিন্তু এত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তাঁর সিনেমার বিষয়বস্তু নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি।
অঞ্জন চৌধুরীর ছবিকে ঘিরে সমালোচকদের একাংশের বক্তব্য ছিল, তিনি বারবার একই ধরনের গল্প তৈরি করছেন। বিশেষ করে তাঁর ছবিতে পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং বউমাদের ঘিরে নানা ঘটনাকে গুরুত্ব দেওয়ায় অনেকে ব্যঙ্গ করে তাঁর সিনেমাকে ‘বৌমা’ সিরিজ বলেও কটাক্ষ করতেন। কিন্তু এই ধরনের সমালোচনা কি পরিচালকের মনে প্রভাব ফেলত? নিজের বাবাকে কাছ থেকে দেখেছেন যিনি, সেই মেয়ে রীনা চৌধুরীর কাছে এই প্রশ্নই রাখা হয়েছিল। বাবার সিনেমা এবং তাঁর সাফল্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রীনা যে উত্তর দিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট, জনপ্রিয়তাকেই তিনি সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে দেখেন।
রীনার কথায়, কোনও কাজ করে যদি সাফল্য পাওয়া যায়, তাহলে সেই সাফল্য নিয়ে অস্বস্তিতে থাকার কোনও কারণ নেই। বিষয়টি বোঝাতে তিনি পড়াশোনার উদাহরণও টেনেছেন। তাঁর বক্তব্য, কলেজে প্রথম হলে এবং অন্য কেউ তাঁকে ছাপিয়ে যেতে না পারলে যেমন খারাপ লাগার কথা নয়, তেমনই একের পর এক ‘বৌমা’ ধরনের ছবি তৈরি করে যদি লক্ষ লক্ষ দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে আনা যায়, তাহলে সেই সাফল্য নিয়ে গর্ব করাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ, ছবির বিষয়বস্তু নিয়ে কে কী বলছেন, তার চেয়ে দর্শক ছবিগুলিকে কীভাবে গ্রহণ করছেন, সেটাই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে রীনা বুঝিয়ে দিয়েছেন, জনপ্রিয় সিনেমাকে ছোট করে দেখার কোনও যুক্তি তিনি খুঁজে পান না।
এখানেই থেমে থাকেননি অঞ্জন-কন্যা। তাঁর বক্তব্য, কাউকে জোর করে বাংলা সিনেমা দেখাতে হয়নি তাঁদের। কাউকে দরজায় দরজায় গিয়ে বলতে হয়নি, বাংলা ছবিকে সমর্থন করুন কিংবা প্রেক্ষাগৃহ ভরিয়ে দিন। দর্শক নিজের ইচ্ছেতেই সিনেমা দেখতে গিয়েছেন। আর সেই দর্শকই যখন বারবার প্রেক্ষাগৃহে ভিড় করেছেন, তখন নিজেদের কাজের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কথা নয় বলেই মনে করেন তিনি। রীনার কথায়, সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। তাই কিছু মানুষ সমালোচনা করলেও তার জন্য নিজের কাজের মূল্য কমিয়ে দেখার কোনও কারণ নেই। তাঁর এই বক্তব্যে উঠে এসেছে বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমার সেই পুরনো বাস্তব, যেখানে দর্শকের ভালোবাসাই ছিল ছবির জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের অন্যতম বড় মাপকাঠি।
আরও পড়ুন: “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই দূরদর্শিতাকে আজ স্যালুট জানাই, বিজেপি সরকারের এই অপদার্থতাকে ধিক্কার!” “প্রাক্তন দুই মুখ্যমন্ত্রীর শাসনকালেই নাগরিক হিসেবে অনেক ভালো ছিলাম, বর্তমানের এই রূপ সহ্য করা যাচ্ছে না!” ২০২৬ অভিশ’প্ত দুর্গাপুজো? চোরবাগানকাণ্ডে ক্ষু’ব্ধ মধুমিতা রায়, মমতা ও বুদ্ধদেবের আমলের স্মৃতি টেনে বিতর্কিত পোস্ট অভিনেত্রীর! সমাজ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া?
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, রীনার মতে, অঞ্জন চৌধুরীর ছবির সাফল্য শুধু দর্শকের ভিড়েই সীমাবদ্ধ ছিল না, প্রযোজকদের কাছেও তার আলাদা গুরুত্ব ছিল। তিনি উদাহরণ দিয়ে বোঝান, কোনও প্রযোজক ছবি তৈরি করে লাভবান হলে তাঁর বাড়ি বা গাড়ির সংখ্যা বাড়তে পারে। অর্থাৎ, ছবি ব্যবসা সফল হলে প্রযোজকের আর্থিক উন্নতিও ঘটত। আর প্রযোজককে খুশি করতে পারাটাও পরিচালকের সাফল্যের একটি বড় দিক। সব মিলিয়ে, অঞ্জন চৌধুরীর সিনেমা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও রীনা চৌধুরীর বক্তব্যে স্পষ্ট, তাঁর কাছে বাবার কাজের মূল্যায়ন হবে দর্শকের ভালোবাসা এবং ছবির সাফল্যের নিরিখেই। ‘বৌমা’ সিরিজ বলে কটাক্ষ করা হলেও, সেই ছবিগুলিই যদি দর্শককে হলে টেনে আনতে পারে, তাহলে সেই সাফল্যকে অস্বীকার করা যায় কীভাবে?






