“অল্প বয়সেই বাবাকে হারিয়েছি, আমার মাকে আমি সুস্থ রাখব কী করে?” “পাঁচ বছর আগের সঙ্গে বর্তমান আমির কোনও মিল নেই” বিয়ের দিনই বদলে গেল সবকিছু, এলেন না বর! ভয়াবহ মুহূর্তে নিজের ক’ষ্ট ভুলে মেয়েকে কীভাবে শক্ত হাতে আগলে রেখেছিলেন মা? কীভাবে সেই ধা’ক্কা সামলে আবার দাঁড়ালেন দেবলীনা দত্ত? মায়ের দেওয়া কোন শিক্ষা তাঁর বড় শক্তি?

বাংলা অভিনয় জগতের পরিচিত মুখ দেবলীনা দত্ত। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পাশাপাশি নিজের স্পষ্ট বক্তব্য, প্রতিবাদী মানসিকতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা অভিজ্ঞতার জন্যও তিনি বারবার আলোচনায় এসেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের একাধিক অজানা অধ্যায় নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন অভিনেত্রী। সেখানে উঠে এল তাঁর শৈশব, মায়ের প্রভাব, পারিবারিক মূল্যবোধ, জীবনের কঠিন সময় পেরিয়ে ওঠা এবং দুঃসাহসিক নানা অভিজ্ঞতার গল্প। বিশেষ করে মায়ের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মায়ের প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে দেবলীনা জানালেন, “পুরোটাই মায়ের প্রভাব।” তাঁর কথায়, বাবাকে মাত্র নয় বছর বয়সে হারানোর পর তাঁর জীবনে মায়ের প্রভাব আরও গভীর হয়ে ওঠে।

মায়ের কাছ থেকে ছোটবেলা থেকেই কীভাবে মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, সততা এবং দায়িত্ববোধের শিক্ষা পেয়েছেন, সেই কথাও জানান দেবলীনা। তাঁর বক্তব্য, “মা আমাকে আলাদা করে বলে শিখিও না, কাজে করো।” রাস্তায় পড়ে থাকা ভাঙা ব্লেড বা কলার খোসা নিজের পা দিয়ে সরিয়ে দিতে মাকে দেখতেন তিনি, যাতে অন্য কারও পায়ে লেগে বিপদ না ঘটে। সেই অভ্যাস এখনও তাঁর মধ্যে রয়ে গিয়েছে বলে জানান অভিনেত্রী। শুধু তাই নয়, সমাজের প্রান্তিক মানুষদের সঙ্গেও কীভাবে সম্মানের সঙ্গে আচরণ করতে হয়, মায়ের কাছ থেকেই তা শিখেছেন তিনি। ছোটবেলায় পরিবারের এক সদস্যকে তাঁর নারীসুলভ আচরণের জন্য উপহাসের শিকার হতে দেখেছিলেন দেবলীনা। তখন মা তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, “এদেরকে নিয়ে কখনও ঠাট্টা করবে না।”

একইভাবে সততার গুরুত্ব বোঝাতে মা বারবার বলতেন, “সৎ থাকো, সব ঠিক থাকবে জীবনে, মিথ্যে কথা একদম বলতে নেই।” ঘুমোতে যাওয়ার আগে গল্প শুনিয়ে সেই গল্প থেকে কী শেখা যায়, সেটিও মেয়ে দেবলীনাকে বুঝিয়ে দিতেন তাঁর মা। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলির একটিতেও মায়ের কথাই তাঁর মাথায় ছিল বলে জানান দেবলীনা। বিয়ের দিন বর না আসার সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিজের কষ্টের থেকেও মায়ের শারীরিক অবস্থার কথা বেশি ভাবছিলেন তিনি। অভিনেত্রীর কথায়, “আমার খালি একটাই ভাবনা, আমার মাকে আমি কী করে সুস্থ রাখব।” তিনি আশঙ্কা করছিলেন, এই ধাক্কায় মায়ের আবার হৃদযন্ত্রের সমস্যা না হয়। সেই সময় পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুরাও তাঁর ও মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

দেবলীনা জানান, “কেউ আঙুল তোলেননি আমার দিকে। কেউ আঙুল তোলেননি আমার মায়ের দিকে। কেউ একটা কটু কথা বলেননি।” তাঁর মতে, সেই কঠিন সময়ে যৌথ পরিবারের সকলে যেভাবে তাঁদের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন, সেটাই তাঁর জীবনের “বিরাট পাওনা”। এই ঘটনার পরও তিনি থেমে থাকেননি। পরের দিনই শুটিংয়ে ফিরেছিলেন। অর্থাৎ ব্যক্তিগত বিপর্যয়কে সামলে পেশাগত দায়িত্ব পালন করার মানসিক শক্তিও তিনি সেখান থেকেই পেয়েছিলেন। বর্তমান জীবনেও মায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক একইরকম গভীর। দেবলীনা জানান, তিনি এখনও মায়ের সঙ্গেই থাকেন গলফ ক্লাব রোডের বাড়িতে। কাজের সুবিধার জন্য একসময় ওই এলাকায় বাড়ি নেওয়া হলেও বর্তমানে মা-মেয়ের একসঙ্গেই থাকা। কঠিন সময় থেকে শুরু করে জীবনের আনন্দের মুহূর্ত সবকিছুতেই মা তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ।

পোখারায় ২২৮ মিটার উঁচু ক্লিফ থেকে বাঞ্জি সুইংয়ের অভিজ্ঞতাতেও মাকে সঙ্গে নিয়েছিলেন তিনি, যদিও ঠিক কী করতে যাচ্ছেন তা আগে জানাননি। আর দেবলীনার এই দুঃসাহসিক মনোভাবের পিছনেও তিনি বাবার প্রভাবের কথা মনে করেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতের বাকেট লিস্টেও রয়েছে আরও নানা অ্যাডভেঞ্চার। তবে সবকিছুর পাশাপাশি তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, সারমেয়দের জন্য একটি বড় শেল্টার তৈরি করা। সাক্ষাৎকারে দেবলীনার কথায় বারবার স্পষ্ট হয়েছে, তাঁর জীবনের ভিত তৈরি হয়েছে পরিবার এবং বিশেষ করে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষায়। কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়া, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং নিজের সঙ্গেও বন্ধুত্ব তৈরি করা সবকিছুর মধ্যেই সেই শিক্ষার ছাপ রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ ‘এতটা অমানবিক কি করে কেউ হতে পারে?’ চারপাশে কা’ন্নার রোল, উত্তম কুমারের নিথর দে’হের পাশে সেদিন যা করেছিলেন রঞ্জিত মল্লিক, ৪৬ বছর পর আজও থামেনি সেই বিতর্ক? মহানায়কের শেষযাত্রায় এমন কী ঘটিয়েছিলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা, সেই দৃশ্য নিয়ে ছিছিক্কার হয়েছিল সর্বত্র?

তিনি মনে করেন, গত পাঁচ বছরে তিনি নিজেকে নতুন করে চিনেছেন এবং আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি শান্তিতে আছেন। নিজের জীবন সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি, “পাঁচ বছর আগেকার আমির সঙ্গে বর্তমান আমির কোনও মিল নেই।” আর সেই পরিবর্তনের নেপথ্যে যেমন জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা রয়েছে, তেমনই রয়েছে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবোধ। তাই দেবলীনার কাছে মা শুধু পরিবারের একজন সদস্য নন, বরং তাঁর জীবনবোধ, সাহস এবং মানুষ হয়ে ওঠার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

You cannot copy content of this page