বিনোদন জগতের তারকাদের ঘিরে এমন বহু গল্প ছড়িয়ে রয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে দর্শকের আড়ালে চলে যায়। পর্দার আলোয় থাকা শিল্পীদের জীবনের এমন কিছু সম্পর্ক ও মুহূর্তও থাকে, যা তাঁদের জনপ্রিয়তার গল্পের বাইরে গিয়ে আলাদা করে মনে রাখার মতো হয়ে ওঠে। বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমার এবং বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বিশিষ্ট চিকিৎসক ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের সম্পর্কও ছিল তেমনই এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। রাজনীতি ও অভিনয়ের দুই ভিন্ন জগতের মানুষ হলেও তাঁদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল স্নেহ, শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার এক বিশেষ সম্পর্ক।
বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের নাম মানেই এক কিংবদন্তি অধ্যায়। পর্দায় মহানায়ক হিসেবে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অভিনয়ের শুরুতে থিয়েটারের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। সিনেমায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগে মঞ্চে নিয়মিত অভিনয় করতেন উত্তম কুমার। সেই সময়ই স্টার থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছিল ‘শ্যামলী’ নাটক, যেখানে তিনি ‘শ্যামল’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। নাটকটি দর্শকদের মধ্যে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে দীর্ঘদিন ধরে মঞ্চস্থ হওয়ার নজির তৈরি করে। আর সেই নাটকই পরবর্তীতে উত্তম কুমার ও বিধানচন্দ্র রায়ের সম্পর্কের একটি বিশেষ অধ্যায়ের সূত্রপাত করে।
‘শ্যামলী’ নাটকের জনপ্রিয়তার কথা শুনে একদিন স্টার থিয়েটারে নাটকটি দেখতে গিয়েছিলেন ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়। উত্তম কুমারের অভিনয়ে তিনি এতটাই মুগ্ধ হন যে নাটক শেষ হওয়ার পর সোজা গ্রিনরুমে চলে যান। সেখানে মহানায়কের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে অভিনন্দন জানান এবং স্নেহভরে বলেন, এরপর থেকে তিনি উত্তম কুমারকে ‘শ্যামল’ নামেই ডাকবেন। সেই থেকেই ‘শ্যামল’ হয়ে ওঠে বিধানচন্দ্র রায়ের দেওয়া উত্তম কুমারের বিশেষ নাম। পরবর্তীকালে চিকিৎসার প্রয়োজনেও যখন মহানায়ক তাঁর কাছে গিয়েছিলেন, তখনও সেই স্নেহের সম্বোধনই বজায় ছিল। তবে তাঁদের সম্পর্ক অন্যদিক নেয় যখন উত্তম কুমার অসুস্থ ছিলেন।
সেই সময় অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়া ও কাজের চাপের কারণে মহানায়ক শারীরিকভাবে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। পেটের সমস্যা, আমাশয় ও গ্যাসের কারণে তিনি যথেষ্ট কষ্ট পাচ্ছিলেন এবং শুটিং করতেও অসুবিধা হচ্ছিল। তখনই তাঁকে ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। উত্তম কুমার তাঁর কাছে গেলে বিধানচন্দ্র রায়ের বাড়িতে তখন রোগীদের ভিড়। মহানায়ককে দেখেই তাঁকে এগিয়ে দেওয়া হয়। ঘরে ঢোকার পর বিধানচন্দ্র রায় তাঁকে দেখে বলেন, ‘কী হে শ্যামল, আবার কী মনে করে?’ উপস্থিত অনেকেই অবাক হয়ে যান মুখ্যমন্ত্রী একজন জনপ্রিয় অভিনেতাকে ‘শ্যামল’ বলে ডাকছেন কেন!
আরও পড়ুনঃ বাবাকে হারিয়েছেন অল্প বয়সেই, বুকে য*ন্ত্রণা তবু চোখে ছিল বড় হওয়ার স্বপ্ন! শিলিগুড়ির সাধারণ পরিবারের ছেলে, অদম্য লড়াই করে মুম্বইয়ের গ্ল্যামার দুনিয়ায় পা, ‘বিগ বস বাংলা’র হাত ধরে ইতিমধ্যেই অসংখ্য মানুষের হৃদয় জিতেছেন রাজবীর দে! আজ জন্মদিনে জানুন তাঁর সংগ্রামের গল্প! টলিউডের আগামীর স্টার হতে চলেছেন তিনি, আপনাদের কি মত?
এরপর উত্তম কুমার নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়ে বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে সাহায্য চান। মহানায়ক তাঁকে বলেন, তিনি খুব কষ্টে রয়েছেন, তাঁকে যেন বাঁচানো হয়। উত্তরে বিধানচন্দ্র রায় তাঁকে আশ্বস্ত করে জানান, এত কিছু ভাবার প্রয়োজন নেই এবং ওষুধ দিলে তিনি সেরে উঠবেন। অর্থাৎ, তাঁকে চিকিৎসা ও আশ্বাস দেওয়ার এই ঘটনাই তাঁদের সম্পর্কের আরেকটি আবেগঘন দিক তুলে ধরে। ‘শ্যামলী’র মঞ্চ থেকে শুরু হওয়া সম্পর্ক পরে অসুস্থতার সময়ও একই স্নেহে অটুট ছিল। তাই উত্তম কুমার ও বিধানচন্দ্র রায়ের এই কাহিনি শুধু একজন মহানায়ক ও একজন চিকিৎসকের গল্প নয়, বরং দুই ভিন্ন জগতের মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া এক আন্তরিক সম্পর্কের স্মৃতি।






