‘অসুর ছাড়াও পেয়ে গেল?’ মা দুর্গার বোধন হতেই জামিন পেলেন ‘অমানুষ’ সন্দীপ ঘোষ! আরজি কর কাণ্ডে অভয়ার নৃ’শংস পরিণতির বিচার চেয়ে ‘রাত জাগো’ পরিণত হলো নিদারুণ পরিহাসে? ক্ষো’ভ উগরে কী লিখলেন শ্রীলেখা মিত্র?

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের আর্থিক দুর্নীতি মামলায় প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে জামিন দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার, দুর্গাপুজোর মহাষষ্ঠীর দিন শীর্ষ আদালতের এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে বাংলার বিভিন্ন মহলে। ২০২৪ সালে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা দেশ উত্তাল হয়েছিল। সেই সময় হাসপাতালের অধ্যক্ষ ছিলেন সন্দীপ ঘোষ। পরে হাসপাতালের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করে সিবিআই। এবার সেই দুর্নীতি মামলাতেই জামিন পেলেন তিনি। এই খবর সামনে আসার পরই সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট করেন অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র। আরজি কর কাণ্ডের বিচার চেয়ে যিনি একসময় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, তাঁর এই সংক্ষিপ্ত পোস্ট ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। সন্দীপের জামিনের খবরের সঙ্গে শ্রীলেখার মন্তব্যের যোগসূত্র খুঁজছেন নেটিজেনদের একাংশ।

সন্দীপ ঘোষের জামিনের খবর সামনে আসার পর শ্রীলেখা নিজের সামাজিক মাধ্যমের পাতায় লেখেন, ‘অসুর ছাড়াও পেয়ে গেলো?!!!!!’ পোস্টে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করলেও, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে এই মন্তব্যের যোগ রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। বিশেষ করে আরজি কর কাণ্ডের পর থেকে শ্রীলেখা যেভাবে নির্যাতিতার বিচার চেয়ে সরব হয়েছিলেন, তাতে তাঁর এই পোস্টকে ঘিরে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। অভিনেত্রী এর আগেও এই ঘটনার প্রতিবাদে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ দাবি করার পাশাপাশি পুলিশ ও স্বাস্থ্য দফতরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। সেই সময় সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলার কারণে তাঁর দুটি বড় বিজ্ঞাপনের কাজ হাতছাড়া হয়েছিল বলেও জানিয়েছিলেন শ্রীলেখা। ফলে সন্দীপ ঘোষের জামিনের পর তাঁর এই নতুন পোস্টকে অনেকেই আরজি কর আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই দেখছেন। যদিও পোস্টে কারও নাম না থাকায় অভিনেত্রী ঠিক কাকে উদ্দেশ করে এই মন্তব্য করেছেন, তা স্পষ্ট নয়।

শ্রীলেখার পোস্টের নীচেও শুরু হয়েছে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া। এক নেটিজেন অভিনেত্রীর মন্তব্যের জবাবে লিখেছেন, ‘সবকিছু জলের মতো পরিষ্কার। সিবিআই, আদালত, সবকিছুই ম্যানেজ করা যায়। সবকিছুরই একটা নির্দিষ্ট দাম রয়েছে।’ এই মন্তব্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তদন্তকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এটি ওই নেটিজেনের ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া, কোনও প্রমাণিত তথ্য নয়। সন্দীপ ঘোষের জামিনের নির্দেশের পিছনে আদালত যে কারণ জানিয়েছে, তা হল দীর্ঘদিন ধরে বন্দি থাকা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ এবং বিচারপতি প্রসন্ন বি ভারালের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্দি থাকলেও মামলার ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র সাত জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পূর্ণ হয়েছে। এই পরিস্থিতি বিবেচনা করেই আদালত জামিন মঞ্জুর করেছে। ফলে জামিনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠলেও আদালতের নির্দেশের নির্দিষ্ট আইনি প্রেক্ষাপটটিও জানা জরুরি।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে এক তরুণী চিকিৎসকের মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার পর ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। ঘটনার তদন্তে প্রথমে কলকাতা পুলিশ এবং পরে সিবিআই যুক্ত হয়। এই মামলায় সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে পৃথক তদন্ত শুরু হয়। সিবিআইয়ের তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হন হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ। অর্থাৎ, তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের মামলা এবং আর্থিক দুর্নীতির মামলা এক নয়। বর্তমান জামিনের নির্দেশটি আর্থিক দুর্নীতির মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি মামলায় জামিন পাওয়ার অর্থ অন্য মামলার অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়া নয়। সন্দীপ ঘোষকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিতর্কের প্রেক্ষিতে এই আইনি বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে।

আরজি কর কাণ্ডের পর শ্রীলেখা মিত্রের প্রতিবাদী অবস্থান তাঁকে বারবার আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। নির্যাতিতার বিচার চেয়ে আন্দোলনের সময় তিনি প্রকাশ্যে নিজের মতামত জানিয়েছিলেন এবং তৎকালীন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেই সময় তাঁর বক্তব্যের জন্য রাজনৈতিক মহলের একাংশের সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে বলে জানিয়েছিলেন অভিনেত্রী। এবার সন্দীপ ঘোষের জামিনের পর তাঁর নতুন পোস্ট সামনে আসায় পুরনো সেই প্রতিবাদের প্রসঙ্গও ফিরে এসেছে। শ্রীলেখার পোস্টটি সংক্ষিপ্ত হলেও ‘অসুর’ শব্দের ব্যবহার এবং প্রশ্নচিহ্নের পুনরাবৃত্তি তাঁর ক্ষোভের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন নেটিজেনদের একাংশ। যদিও তিনি সরাসরি সন্দীপ ঘোষের নাম উল্লেখ করেননি, তবুও জামিনের খবরের পরপরই পোস্টটি আসায় দুটির মধ্যে যোগসূত্র নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে কেউ তাঁর অবস্থানকে সমর্থন করছেন, আবার কেউ আদালতের সিদ্ধান্তের আইনি দিকটি বিবেচনা করার কথাও বলছেন।

আরও পড়ুনঃ “পুজোয় সবাই কিন্তু নতুন জামাকাপড় পায় না, তবে আমরা কেন পরব?” শৈশবে মনে প্রশ্ন জাগতেই বদলে যায় উৎসবের চিত্র! এই ভাবনা থেকেই বিশেষ উদ্যোগ দেবশঙ্কর হালদারের, প্রতি বছর দুর্গাপুজোয় দুঃস্থদের জন্য কী করেন অভিনেতা? আজও নবমীর দিনে কোথায় যাওয়ার অভ্যাস রয়েছে তাঁর?

সব মিলিয়ে সন্দীপ ঘোষের জামিন এবং শ্রীলেখা মিত্রের পোস্ট, দুই বিষয়কে কেন্দ্র করেই নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। একদিকে দীর্ঘ বন্দিদশা ও বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির কথা মাথায় রেখে সুপ্রিম কোর্ট জামিন মঞ্জুর করেছে, অন্যদিকে আরজি কর কাণ্ডের বিচার চেয়ে সরব হওয়া শ্রীলেখার মন্তব্য নতুন করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁর পোস্টে সরাসরি কারও নাম না থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটিকে ঘিরে নানা ব্যাখ্যা সামনে আসছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে করা অভিযোগ বা মন্তব্যকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখা যায় না। আদালতের জামিনের নির্দেশও মামলার অভিযোগ থেকে চূড়ান্ত মুক্তি নয়। আরজি কর কাণ্ডের পর থেকে ন্যায়বিচার নিয়ে যে প্রশ্ন ও ক্ষোভ সমাজের একাংশে রয়েছে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তা আরও একবার সামনে এসেছে। আপাতত শ্রীলেখার পোস্ট ঘিরে আলোচনা অব্যাহত, আর সন্দীপ ঘোষের জামিনের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকেও নজর রয়েছে।

You cannot copy content of this page