বিনোদন জগতে এমন অনেক শিল্পী থাকেন, যাঁদের অভিনয় মানুষের মনে চিরকাল থেকে যায়। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় পর্দা, বদলে যায় দর্শকের পছন্দ, কিন্তু কিছু চরিত্র কখনও পুরনো হয় না। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সেই চরিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের স্মৃতি। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, একসময় যাঁদের অভিনয়ে মুগ্ধ হতেন দর্শক, জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাঁদের অনেককেই কাটাতে হয় নিঃসঙ্গতায়। পর্দার মহিষাসুর অমলকুমার চৌধুরির জীবন যেন সেই নির্মম বাস্তবেরই এক উদাহরণ। মহালয়ার ভোরে তাঁর সেই ভয় ধরানো অট্টহাসি আজও বাঙালির স্মৃতিতে উজ্জ্বল, অথচ শেষ জীবনে অভাব আর একাকিত্বই হয়ে উঠেছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।
নয়ের দশকে দূরদর্শনে মহালয়ার অনুষ্ঠানে মহিষাসুরের চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পেয়েছিলেন অমলকুমার চৌধুরি। দর্শকের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘অমল অসুর’ নামে। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি, অভিনয়ের ধরন এবং ভয়ংকর অট্টহাসি মহালয়ার স্মৃতির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। মহিষাসুর ছাড়াও কখনও যমরাজ, কখনও সেনাপতির চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি ছবি আঁকাতেও ছিল তাঁর দক্ষতা। অশোকনগরের বাসিন্দা অমলবাবু পাড়ার বহু ছাত্রছাত্রীকে আঁকা শেখাতেন। একসময় যে মানুষটি অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের নজর কেড়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনিই ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকেন প্রচারের আলো থেকে।
জীবনের একটা সময় পর্যন্ত পরিচিতি থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেই পরিচিতি আর সেভাবে কাজে আসেনি। স্টুডিয়োপাড়ার ব্যস্ততা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যান অমলবাবু। একসময় যাঁর অভিনয় দর্শকের মনে দাগ কেটেছিল, তাঁকেই যেন ধীরে ধীরে ভুলে যেতে শুরু করে বিনোদন জগৎ। কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি জীবনের নানা প্রতিকূলতার মুখেও পড়তে হয় তাঁকে। অথচ শিল্পীর জীবন তো শুধু পর্দার আলোয় সীমাবদ্ধ নয়। পর্দার বাইরেও থাকে তাঁর নিজস্ব লড়াই, বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং একটু ভালো থাকার স্বপ্ন। অমলবাবুর জীবনেও সেই লড়াই ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছিল।
জীবনের শেষ দিকে তাঁর সঙ্গী হয়ে উঠেছিল অভাব, শারীরিক অসুস্থতা আর নিঃসঙ্গতা। একে একে প্রিয়জনেরা চলে যাওয়ায় আরও একা হয়ে পড়েন তিনি। টিনের চালের ঘরে কাটত দিন। আঁকার কিছু কাজই ছিল তাঁর উপার্জনের অন্যতম ভরসা। যে মানুষটি একসময় পর্দায় অসুরের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে ভয় ধরিয়েছিলেন, বাস্তব জীবনে তাঁকেই লড়াই করতে হয়েছে প্রতিদিনের অনিশ্চয়তার সঙ্গে। অবশেষে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি, পৌষ সংক্রান্তির দিনে, মাত্র ৬৬ বছর বয়সে প্রয়াত হন অভিনেতা অমলকুমার চৌধুরি। তাঁর মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে আসে অশোকনগর এলাকায়।
আরও পড়ুনঃ ‘ঘরে বাইরে’ থেকে ‘দেবী চৌধুরানী’, অন্যতম সেরা দুই ছবিতে নায়িকা হওয়ার কথা ছিল সুচিত্রা সেনের! কেন কিংবদন্তি পরিচালকের ছবি থেকে বাদ পড়েছিলেন মহানায়িকা? কোন কারণে সত্যজিৎ রায়ের কোনও ছবিতে দেখা যায়নি সুচিত্রা সেনকে? বিজয়া রায়ের স্মৃতিচারণে ফাঁস অজানা কাহিনি!
অমলবাবুর চলে যাওয়া শুধু একজন অভিনেতার মৃত্যু নয়, বরং বাংলা বিনোদন জগতের এমন এক পরিচিত মুখের বিদায়, যাঁর অভিনয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু বাঙালির শৈশবের স্মৃতি। প্রতি বছর মহালয়ার ভোরে যখন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ বেজে ওঠে, তখন সেই সময়ের মহিষাসুরের চরিত্রও ফিরে আসে স্মৃতিতে। কিন্তু সেই চরিত্রের আড়ালে থাকা মানুষটির জীবনের শেষ দিনগুলি কতটা কঠিন ছিল, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। অমল অসুরের সেই অট্টহাসি হয়তো আরও বহু বছর বাঙালির কানে বাজবে। কিন্তু তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়, শিল্পীর জনপ্রিয়তা একদিন ফিকে হয়ে গেলেও তাঁর অবদানকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়।






