“মাথায় হাত, কী করব?” “আমি বললাম ছাড়ব না, কপালে যা আছে তাই হবে!” শরীরে জন্ডিস, বিলিরুবিন ১৩.৬! চিকিৎসক দিয়েছিলেন তাড়াতাড়ি হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ! তবুও অভিনয়ের ক্ষিদে, ‘জন্মভূমি’র সুযোগ ছাড়েননি ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়! মমতা শঙ্করের পাঠানো ছবিতে ফাঁস করলেন, এতদিন গোপন থাকা জীবনের লড়াই?

বাংলা টেলিভিশনের পরিচিত মুখ অভিনেতা ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিক ‘জন্মভূমি’। এই ধারাবাহিকের হাত ধরেই দর্শকমহলে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি। তবে পর্দায় জনপ্রিয়তা পাওয়ার পিছনে যে কতটা লড়াই করতে হয়েছিল, সম্প্রতি সেই অজানা অধ্যায়ের কথাই প্রকাশ্যে আনলেন অভিনেতা। সমাজমাধ্যমে বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মমতা শঙ্করের সঙ্গে নিজের একটি পুরনো ছবি ভাগ করে নিয়েছেন ভাস্বর। ছবিটি তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে অভিনয় জীবনের শুরুর দিকের দিনগুলিতে। সেই সময় একাধিকবার ডাক পেয়েও শেষ পর্যন্ত কাজ পাননি তিনি। পরিচালকের কাছ থেকে চিত্রনাট্য নিয়ে মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে মুখস্থ করে শোনাতে হত। অভিনেতার দাবি, সংলাপ মুখস্থ করার ক্ষেত্রে তাঁকে কেউ হারাতে পারতেন না। এক লাইনও এদিক-ওদিক হত না তাঁর। তবুও বারবার অডিশন দেওয়ার পর তাঁকে আর নির্বাচিত করা হত না। স্বাভাবিকভাবেই মন খারাপ হত তাঁর। তবে অভিনেতার কথায়, ‘কপালে যা আছে তাই হবে।’

অবশেষে একদিন এল সেই বহু প্রতীক্ষিত সুযোগ। ভাস্বরের কাছে খবর এল, ‘জন্মভূমি’ ধারাবাহিকের গল্পে প্রজন্মের পরিবর্তন হচ্ছে এবং সেখানে মুখ্য চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ রয়েছে তাঁর। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই জীবনের কঠিন শারীরিক সমস্যার মুখে পড়েন অভিনেতা। ভগৎ সিংকে নিয়ে তৈরি ছবির জন্য ডাবিংয়ের কাজ শেষ করে কলকাতায় ফিরেছিলেন তিনি। আর তখনই ধরা পড়ে জন্ডিস। শরীরে বিলিরুবিনের মাত্রা পৌঁছে গিয়েছিল ১৩.৬-এ। চিকিৎসক তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে ধারাবাহিকে অভিনয়ের প্রস্তাব আসায় কার্যত দোটানায় পড়ে যান ভাস্বর। একদিকে অসুস্থ শরীর, অন্যদিকে বহুদিনের স্বপ্নপূরণের সুযোগ। কিন্তু এতদিনের অপেক্ষার পর পাওয়া এই কাজ কোনওভাবেই হাতছাড়া করতে চাননি তিনি। তাই নিজের মনস্থির করে ফেলেন। অভিনেতার কথায়, ‘মাথায় হাত, কী করব? আমি বললাম এ আমি ছাড়ব না।’

শরীর তখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। ভাস্বর জানিয়েছেন, সেই সময় অড়হর পাতার রস খেয়ে তাঁর শরীরে বিলিরুবিনের মাত্রা কিছুটা কমেছিল বলে তিনি মনে করেছিলেন। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, তা নেমে এসেছিল ২.৪-এ। তবে দুর্বলতা তখনও কাটেনি। সেই শারীরিক অবস্থাতেই শুটিংয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন অভিনেতা। বাড়ি থেকে নিজের খাবার এবং জল নিয়ে যেতেন তিনি। শুটিং চলাকালীন মাঝেমধ্যেই মাথা ঘুরত, শরীরেও যথেষ্ট কষ্ট হত। কিন্তু অভিনয়ের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে কোনও কিছুকেই গুরুত্ব দিতে চাননি। নিজের জেদের কাছে শারীরিক অসুস্থতাকেও হার মানিয়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি মমতা শঙ্করের পাঠানো পুরনো ছবিটি দেখেই সেই দিনগুলির কথা মনে পড়ে যায় তাঁর। ছবির প্রসঙ্গ টেনে ভাস্বর লিখেছেন, ‘এই যে ছবিটা দেখছেন, আমার চোখ দেখলেই বুঝতে পারবেন সামান্য হলুদ হয়ে আছে।’ অর্থাৎ সেই সময় শুটিংয়ের ফাঁকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেও তাঁর শরীরে জন্ডিসের প্রভাব স্পষ্ট ছিল।

Actor Life

তবে শুটিংয়ের সময় সেটে উপস্থিত কেউই তাঁর অসুস্থতার কথা জানতেন না বলে জানিয়েছেন অভিনেতা। নিজের শারীরিক সমস্যার কথা প্রথমদিকে সহ-অভিনেতাদের কাছেও প্রকাশ করেননি তিনি। পরে তাঁদের কয়েকজনকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। এতদিন ধরে এই অভিজ্ঞতা নিজের মধ্যেই রেখে দিয়েছিলেন ভাস্বর। এমনকি সমাজমাধ্যমেও আগে কখনও এই ঘটনা নিয়ে কিছু লেখেননি। মমতা শঙ্করের পাঠানো ছবিটি সেই পুরনো স্মৃতিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। তাই এবার প্রথমবার প্রকাশ্যে নিজের সেই কঠিন সময়ের কথা জানালেন তিনি। উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে ‘জলতরঙ্গ’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে টেলিভিশনে অভিনয় শুরু করেছিলেন ভাস্বর। এরপর ‘জন্মভূমি’র বিক্রম চরিত্রটি তাঁকে দর্শকদের কাছে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তীকালে বাংলা ধারাবাহিক ও চলচ্চিত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ‘মায়ার বাঁধন’, ‘ইষ্টি কুটুম’, ‘বিন্নি ধানের খই’, ‘গৌরী এলো’ এবং ‘গোধূলি আলাপ’-এর মতো ধারাবাহিকেও দেখা গিয়েছে তাঁকে। ফলে অভিনয় জীবনের এই পুরনো অধ্যায় তাঁর কাছে নিঃসন্দেহে বিশেষ স্মৃতির।

আরও পড়ুনঃ ‘আমার প্রেম টেকার কোনও চান্স নেই!’ ‘নিজেকে নিয়েই খুশি’ বিক্রম চট্টোপাধ্যায়ের অকপট স্বীকারোক্তিতে চর্চা তুঙ্গে! কেন নিজের জীবন নিয়ে এমন মন্তব্য অভিনেতার? প্রেম কি সত্যিই তাঁর কাছে সমস্যা, প্রকাশ্যে আনলেন কোন তিক্ত অভিজ্ঞতা?

নিজের পোস্টের শেষদিকে ভাস্বর বুঝিয়ে দিয়েছেন, জীবনের সেই সময়টা কতটা কঠিন ছিল, তা আজও তাঁর স্মৃতিতে স্পষ্ট। একদিকে বারবার অডিশন দিয়েও সুযোগ না পাওয়া, অন্যদিকে গুরুতর অসুস্থতা নিয়েও কাজ চালিয়ে যাওয়া, সব মিলিয়ে ‘জন্মভূমি’ তাঁর অভিনয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। যে ছবিটি এতদিন হয়তো শুধুই অতীতের একটি মুহূর্ত ছিল, মমতা শঙ্করের পাঠানোর পর সেটিই হয়ে উঠল তাঁর জীবনের এক অজানা লড়াইয়ের সাক্ষী। ছবির সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে অভিনেতা লিখেছেন, ‘আর আজ এই প্রথম সমাজমাধ্যমে বললাম।’ অর্থাৎ এত বছর ধরে নিজের অসুস্থতা এবং সেই সময়ের শারীরিক কষ্টের কথা প্রকাশ্যে আনেননি তিনি। এবার পুরনো ছবি ঘিরে সেই অভিজ্ঞতাই অনুরাগীদের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন ভাস্বর। জনপ্রিয়তার পিছনে থাকা পরিশ্রমের পাশাপাশি তাঁর এই অজানা লড়াইয়ের কথা সামনে আসতেই নতুন করে চর্চায় অভিনেতার অভিনয় জীবনের শুরুর দিনগুলি।

You cannot copy content of this page