পর্দায় কখনও দ্রৌপদী, কখনও দাপুটে অভিনেত্রী, আবার কখনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন পরিচয়ে দর্শকদের সামনে এসেছেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। মহাভারতে দ্রৌপদীর চরিত্রে অভিনয় করে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পর্দার সেই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল জীবনের নানা লড়াই, আর্থিক চাপ এবং নিজের দায়িত্ব সামলানোর কঠিন অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের নানা অজানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন অভিনেত্রী তথা বিজেপি নেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে কীভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একসময় খাবারদাবার থেকেও নানা কিছু বাদ দিতে হয়েছিল তাঁকে।
অভিনেত্রীর কথায়, একটা সময় বাড়ির ঋণ শোধ করাটাই তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অভিনয় করে উপার্জন করলেও সেই টাকা দিয়ে বাড়ির ঋণ শোধ করা এবং সংসারের দায়িত্ব সামলানো সহজ ছিল না। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, খরচ কমাতে নিজের খাবারদাবারেও কাটছাঁট করতে হয়েছিল তাঁকে। রূপা জানান, তিনি মাছ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন, এমনকি বহু বছর দুধ খাওয়াও বন্ধ রেখেছিলেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতা বুঝিয়ে দেয়, আর্থিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল তাঁকে। নিজের প্রয়োজনকে পিছনে রেখে দায়িত্ব পালন করাই তখন তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু কেন এতটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল অভিনেত্রীকে? সাক্ষাৎকারে রূপা বুঝিয়েছেন, শুধুমাত্র জনপ্রিয়তা থাকলেই যে জীবনের সমস্ত আর্থিক সমস্যা মিটে যায়, এমনটা নয়। অভিনয় জগতে কাজ পাওয়া, নিজের উপার্জন বজায় রাখা এবং সেই উপার্জন দিয়ে বড় দায়িত্ব সামলানো, সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। তিনি এমন ছবিতে অভিনয় করতে চেয়েছিলেন, যেখানে নিজের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রাখা সম্ভব। কিন্তু সেই সময় বাড়ির ঋণ শোধ করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁর ছিল না বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী। তাঁর কথায়, গৌতম ঘোষ এবং অপর্ণা সেনের মতো পরিচালকদের ছবিতে কাজ করলেই যে সমস্ত আর্থিক দায়িত্ব মিটে যাবে, তা নয়। অর্থাৎ, অভিনয়জীবনে সাফল্য থাকলেও বাস্তব জীবনের আর্থিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না।
রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনের লড়াই অবশ্য শুধু আর্থিক সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনীতিতে আসার পর অভিনয়জগতের সঙ্গে তাঁর দূরত্বও বেড়েছে। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ২০১৪ সালে প্রথম নির্বাচনে দাঁড়ানোর প্রস্তাব পেয়েও সঙ্গে সঙ্গে রাজি হতে পারেননি। তখন তাঁর হাতে একাধিক কাজ এবং নানা প্রতিশ্রুতি ছিল। পরবর্তীকালে রাজনীতিতে পুরোপুরি মন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাঁর মতে, অভিনয় এমন একটি পেশা যেখানে সম্পূর্ণ সময় ও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও দায়িত্ব পালন করতে হলে পুরোপুরি সময় দিতে হয়। এই কারণেই অভিনয়ের একাধিক সুযোগ ছাড়তে হয়েছে তাঁকে। এমনকি একসময় বাড়ির ঋণ শোধ করার মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকার কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন অভিনেত্রী।
আরও পড়ুনঃ ‘মমতার আমলে যা শেষ হয়েছে…১৫ বছরের ক্ষ’তি মেটাতে কত বছর লাগবে জানি না’, বিশ্বাস ব্রাদার্সের ক্ষমতার নেপথ্যে কি শুধুই ছিল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর হাত? কতটা হাল বদলেছে নতুন সরকার আসতেই? টলিউডে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে শিল্পীদের অবস্থা নিয়ে মুখ খুললেন বিজেপি নেতা, অভিনেতা সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়!
সব মিলিয়ে, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের এমন একটি দিক সামনে আনে, যা পর্দার পরিচিত মুখটির আড়ালে অনেকেরই অজানা। জনপ্রিয়তা, অভিনয়ের সাফল্য কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও একজন মানুষের ব্যক্তিগত লড়াই থাকে। বাড়ির ঋণ শোধ করতে গিয়ে মাছ খাওয়া কমানো, বহু বছর দুধ না খাওয়া এবং নিজের ইচ্ছাকে পিছনে সরিয়ে দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। তাঁর জীবনের এই অধ্যায় মনে করিয়ে দেয়, বাইরে থেকে সাফল্য যতই উজ্জ্বল দেখাক, তার পিছনে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে ত্যাগ, কঠিন সিদ্ধান্ত এবং নিজের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে এগিয়ে চলার গল্প।






