রাজ্যের প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী তথা সঙ্গীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারির ঘটনায় মুখ খুললেন গায়িকা ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়। পুজোর ই-পাস দুর্নীতি মামলায় বুধবার ইডির জেরার পর সিজিও কমপ্লেক্স থেকে বেরনোর সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। অভিযোগ, ইন্দ্রনীল সেনের মন্ত্রীত্বকালে পুজোর ই-পাস সংক্রান্ত আর্থিক দুর্নীতি হয়েছিল। এই গ্রেপ্তারির পরেই নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে খুশি প্রকাশ করেছেন ঋদ্ধি। উল্লেখ্য, এর আগে তৃণমূল সরকারের আমলে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের কাজকর্ম নিয়ে একাধিক অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। এমনকী মুখ্যমন্ত্রীর জনতার দরবারে গিয়েও নিজের অভিযোগের কথা জানিয়েছিলেন এই সঙ্গীতশিল্পী।
ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারি প্রসঙ্গে ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ২০২০ সাল থেকেই ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন তিনি। সঙ্গীতজগতের অন্দরে কী ধরনের পরিস্থিতি চলত, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী বলেও দাবি করেছেন গায়িকা। তাঁর অভিযোগ, সেই সময় বহু শিল্পী অন্যায়ের শিকার হয়েছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপোষণ এবং নির্দিষ্ট কিছু শিল্পীকে কাজের সুযোগ দেওয়ার প্রবণতা সঙ্গীতজগতের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ঋদ্ধির বক্তব্য, ইন্দ্রনীল সেনের গানের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ছিল, কিন্তু ক্ষমতা ও সবকিছু পাওয়ার আগ্রাসী আকাঙ্ক্ষা তাঁর পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন তিনি। নিজের অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ঋদ্ধি জানান, তৎকালীন তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের অধীনে বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠান ও মঞ্চে কাজের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনপোষণ চলত বলে তাঁর অভিযোগ।
তাঁর দাবি, নির্দিষ্ট কিছু শিল্পী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠরা বারবার সুযোগ পেতেন, অথচ অন্যরা বঞ্চিত হতেন। তিনি বলেন, “আমি দেখেছি চোখের সামনে স্বজনপোষণ হতো এবং সরকারি আধিকারিকরাও তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।” তাঁর অভিযোগ, বাংলায় বহু প্রতিভাবান শিল্পী থাকা সত্ত্বেও মাত্র কয়েকজনের হাতে কাজের সুযোগ সীমাবদ্ধ হয়ে থাকত। এই পরিস্থিতির প্রতিবাদ জানাতেই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর জনতার দরবারে গিয়েছিলেন। ঋদ্ধির দাবি, তাঁর অভিযোগের পর মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে যোগাযোগ রাখা হয়েছিল এবং ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্যও নেওয়া হয়েছিল। শুধু শিল্পীদের কাজের সুযোগ নয়, ব্যক্তিগতভাবেও এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছিল বলে দাবি করেছেন ঋদ্ধি।
তাঁর অভিযোগ, তাঁকে সরকারি অনুষ্ঠান থেকে কার্যত দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। সরকারি হল পাওয়া, সঙ্গীত মেলা, ২৫ বৈশাখ এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন ও রজনীকান্ত সেনের গান নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও তিনি সুযোগ পেতেন না বলে জানিয়েছেন গায়িকা। ২৬ বছর ধরে সঙ্গীতজগতের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং দেশ-বিদেশে বাংলা গান ও পঞ্চকবির গান পরিবেশন করার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ঋদ্ধি বলেন, তাঁর মতো শিল্পীর সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটলে গ্রামগঞ্জ থেকে উঠে আসা নতুন প্রতিভাদের পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তাঁর মতে, প্রতিভার পরিবর্তে লবি বা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা কাজের সুযোগ নির্ধারণ করলে রাজ্যের সংস্কৃতির মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরও পড়ুনঃ “তিনবার সরকার পাল্টাতে দেখলাম, কিন্তু আমি পাল্টাইনি কারণ রাজনীতি আমার পেশা নয়!” “সাধারণত আমি বোকাদের সঙ্গে কাজ করি না…রুদ্রনীল নিজের কাজ করছে, অনির্বাণ নিজের মতাদর্শে চলেছে” রাজনৈতিক আনুগত্যের টানাপড়েনে যখন টলিউড বারবার বিভক্ত, তখন সব হিসাবের বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের দর্শন স্পষ্ট করলেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়!
তবে ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারি নিয়ে খুশি হলেও গোটা সঙ্গীতজগতকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করার দাবি তুলেছেন ঋদ্ধি। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের আমলে যে লবির প্রভাব ছিল, তার সঙ্গে যুক্ত কিছু শিল্পী ও আধিকারিক এখনও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সুযোগ পাচ্ছেন। এই বিষয়টিও মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আনতে চান তিনি। একইসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে সিনিয়র শিল্পীদের আরও সক্রিয় হওয়া উচিত ছিল। ঋদ্ধির কথায়, ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সরব হয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করবেন। তাঁর আশা, এই ঘটনার পর অন্তত সঙ্গীতজগতে স্বজনপোষণ কমবে, কাজের সুযোগে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা নিজেদের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলির চূড়ান্ত সত্যতা বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।






