পুজো হবেই না আর, ঠিকই করে ফেলেছিলেন! অত্যন্ত প্রিয়জনকে হারিয়ে পুজো বন্ধের সিদ্ধান্ত, হঠাৎ মহালয়ার রাতে এমন কী ঘটল? সুদীপা চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে দেবী দুর্গা এলেন কীভাবে? জানেন, নেপথ্যে কি ছিল সেই ‘অলৌকিক স্বপ্ন’?

প্রতি বছরই বালিগঞ্জের বাড়িতে ধুমধাম করে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন অভিনেতা ও সঞ্চালক সুদীপা চট্টোপাধ্যায়। তবে এ বছর পরিস্থিতি ছিল একেবারেই আলাদা। কয়েক মাস আগেই পরিবারে ঘটে যায় এক অঘটন, প্রয়াত হন অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায়ের নিজের দিদি। তাঁর মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই মন খারাপ ছিল গোটা পরিবারের। তাই এ বছর বাড়ির পুজো আদৌ হবে কি না, তা নিয়েই তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। এমনকি পুজো হলেও ঘটপুজো করেই সেরে ফেলার কথা ভেবেছিলেন তাঁরা। পুজো শুরুর মাত্র পাঁচ দিন আগেও সিদ্ধান্ত প্রায় একই ছিল। কিন্তু মহালয়ার রাতে এমন একটি ঘটনা ঘটে, যা বদলে দেয় চট্টোপাধ্যায় বাড়ির পুজোর পুরো ছবিটাই।

চট্টোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজোয় বহু বছর ধরেই প্রতিমা তৈরি করেন শিল্পী পশুপতি রুদ্রপাল। এ বছরও সেই মতো প্রতিমা তৈরির কথা ছিল। কিন্তু পুজো হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ায় প্রতিমা তৈরির বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। সুদীপা জানান, নিয়ম অনুযায়ী একবার শক্তির দেবী দুর্গা বা কালীর কাঠামো তৈরি হয়ে গেলে সেটি ভেঙে সেই মাটি দিয়ে অন্য প্রতিমা তৈরি করা যায় না। এর মধ্যেই মহালয়ার রাতে পশুপতিবাবু সুদীপাকে একটি ছবি পাঠান। ছবিতে দেখা যায়, প্রতিমার চক্ষুদানও হয়ে গিয়েছে। প্রথমে সুদীপা বুঝতেই পারেননি যে সেটি তাঁদের বাড়ির দুর্গাপ্রতিমা। তখনও তিনি ধরে নিয়েছিলেন এ বছর পুজো হবে না।

এরপর পশুপতি রুদ্রপাল ফোন করে সুদীপাকে জানান, প্রতিমাটি তাঁদের বাড়িরই। শিল্পী তাঁকে বলেন, মহালয়ার আগের রাতে তিনি এমন একটি স্বপ্ন দেখেছেন, যা হয়তো সুদীপাকে বিশ্বাস করানো কঠিন হবে। সেই স্বপ্নে ঘাটের কাছে পা এবং সুদীপার মেয়ের তাঁর কাছেই আসতে চাওয়ার মতো ইঙ্গিত পেয়েছিলেন তিনি। পশুপতিবাবুর কথায়, তিনি তাঁর কাজটুকু করে দিয়েছেন, এবার প্রতিমাকে ঘরে আনবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত সুদীপাকেই নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, তিনি সংসারী মানুষ এবং তাঁকে দিয়ে কোনও অন্যায় করানো উচিত হবে না। এই ঘটনার পর আর পুজো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে থাকতে পারেননি সুদীপা। তাঁর কথায়, বিয়ের পর থেকে যে দেবীকে তিনি সন্তানের মতো করে ঘরে নিয়ে আসেন, এ বার যেন তিনিই নিজে আসতে চেয়েছেন।

এরপর একেবারে শেষ মুহূর্তে শুরু হয় পুজোর প্রস্তুতি। সুদীপা জানান, মাত্র দেড় দিনের মধ্যে প্যান্ডেল তৈরি হয়ে যায়। পাশাপাশি খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও শেষ মুহূর্তে সম্পূর্ণ করা হয়। তাঁর বিশ্বাস, মা না চাইলে এত অল্প সময়ে কোনও কিছুই সম্ভব হত না। তবে এখানেই শেষ নয়, প্রতিমা বাড়িতে আসার পরও মাকে ঘিরে তাঁর সঙ্গে যেন মেয়ে-মায়ের মতোই সম্পর্ক তৈরি হয়। পঞ্চমীতে প্রতিমাকে নিয়ে আসার পর সুদীপা নাকি মায়ের কানে কানে বলেন, দিন দিন তিনি ‘ভূত’ হয়ে যাচ্ছেন কেন এবং কেন তাঁকে ভয় দেখাচ্ছেন। সুদীপার বক্তব্যে স্পষ্ট, এই পুজোয় দেবীকে তিনি কেবল আরাধ্যের জায়গায় দেখেন না, বরং নিজের মেয়ের মতো করেই আপন করে নেন।

আরও পড়ুন: মহালয়ার ‘মহিষাসুরমর্দিনী’তে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জায়গায় হিন্দিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন যিনি, ‘নমো চণ্ডী’র সেই বাঙালি শিল্পীই আজ বিস্মৃতির আড়ালে! শতবর্ষ পেরিয়েও পাননি প্রাপ্য সম্মান, বরং শেষজীবনে পেয়েছেন অসীম কষ্ট! চেনেন এই কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী তথা ভাষ্যকারকে?

প্রতি বছরই সুদীপার বাড়ির পুজোয় টলিপাড়ার একাধিক পরিচিত মুখের দেখা মেলে। এ বছর পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে আয়োজন কিছুটা ছোট হলেও সেই ছবিতে খুব একটা পরিবর্তন হচ্ছে না। অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ও এ বারের পুজোয় আসতে পারেন বলে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে মায়ের বেনারসী কেনার জন্য অর্থ পাঠিয়েছেন অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। এছাড়াও অঙ্কুশ হাজরা এবং পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের মতো পরিচিত মুখদেরও দেখা মিলতে পারে চট্টোপাধ্যায় বাড়ির পুজোয়। অর্থাৎ শেষ মুহূর্তের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ফের উৎসবের সাজে সেজে উঠেছে সুদীপার বাড়ি। প্রতিমা এসে যাওয়ার পর পরিবারের পুজোও ফিরেছে আগের ছন্দে।

সুদীপার কাছে তাই এ বছরের দুর্গাপুজো নিছক পারিবারিক একটি আয়োজন নয়, বরং একাধিক আবেগ এবং অদ্ভুত ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বিশেষ পুজো। প্রিয়জনকে হারানোর পর প্রথমে যখন পুজো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল, তখন মহালয়ার রাতের সেই স্বপ্নই পরিস্থিতি বদলে দেয়। শিল্পী পশুপতি রুদ্রপালের সেই অভিজ্ঞতার পর তৈরি হয়ে যাওয়া প্রতিমা শেষ পর্যন্ত চট্টোপাধ্যায় বাড়িতেই আসে। সুদীপাও মনে করেন, দেবী যেন নিজেই তাঁর বাড়িতে আসতে চেয়েছেন। তাই অল্প সময়ের মধ্যে সব আয়োজন সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছে বলে তাঁর বিশ্বাস। এই রহস্যময় ঘটনার পর এ বছরও চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে নিয়ম মেনেই শুরু হয়েছে দেবীর আরাধনা।

You cannot copy content of this page