“কাজ পান না, চরম অর্থকষ্টে দিন কাটছে নিমাই ঘোষের!” সামাজিক মাধ্যমে ছড়াচ্ছে একের পর এক এমনই উদ্বেগজনক খবর, কেউ তাঁর নামে সংগ্রহ করছেন অর্থ! কিন্তু বাস্তবটা কি সত্যিই এমন? ৮৬-তেও সমান উদ্যমে কাজ করছেন, বর্ষীয়ান অভিনেতা সবচেয়ে বড় অভাব অর্থ নয়, তবে কী? এবার সামনে এল অন্য ছবি?

বাংলা সিনেমার পর্দায় যে মুখটি বহুবার দেখেছেন দর্শক, তাঁর নাম মনে রেখেছেন কতজন? বর্ষীয়ান অভিনেতা নিমাই ঘোষ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ২০০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। ছোট-বড় নানান চরিত্রে তাঁকে দেখা গিয়েছে বাংলা সিনেমা, থিয়েটার এবং ধারাবাহিকে। বয়স এখন ৮৬, কিন্তু অভিনয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এখনও শেষ হয়ে যায়নি। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন নাট্য ও সিনেমা জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায় এবং অভিনেতা দেবনাথ চট্টোপাধ্যায়। উল্টোডাঙ্গার কাছে নিমাই ঘোষের এলআইজি হাউজিংয়ের বাড়িতে গিয়ে প্রায় দু’ঘণ্টা তাঁর সঙ্গে আড্ডা দেন তাঁরা। ২৯ সেপ্টেম্বরের সেই সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা থেকেই উঠে এসেছে অভিনেতার বর্তমান জীবনের এক অন্য ছবি।

সেখানে শুধু অভাবের কথা নয়, তাঁর স্মৃতি, গল্প এবং কাজের প্রতি আগ্রহও সামনে এসেছে। দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ২৯ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টা ৫ বা ১০ মিনিট নাগাদ তাঁরা নিমাই ঘোষের বাড়িতে ঢুকেছিলেন। আড্ডা গড়ায় প্রায় দু’ঘণ্টা, তাঁরা বেরোনোর সময় তখন প্রায় একটা বাজে। নিমাই ঘোষের তখন স্নান এবং খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছিল, না হলে হয়তো আড্ডা আরও চলত বলেই জানিয়েছেন দেবশঙ্কর। থিয়েটার থেকে রাজনীতি, পুরনো দিনের পাড়া, খাওয়াদাওয়া, পরিবার এবং বিডন স্ট্রিটে কাটানো ছোটবেলার নানান স্মৃতি উঠে আসে কথায়। উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, শম্ভু মিত্র থেকে মৃণাল সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী এবং গৌতম ঘোষের প্রসঙ্গও আসে।

নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে খরাজ মুখোপাধ্যায়, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, নান্দীকার এবং বহুরূপীর কথাও বলেন নিমাই। এমনকী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, সত্তরের দশক এবং বামপন্থার রাজনীতিও উঠে আসে সেই আড্ডায়। এই দীর্ঘ স্মৃতিচারণ শুনে মুগ্ধ দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, “ছিয়াশি বছরের একজন মানুষ কী করে এত স্মৃতিধর হন, ভাবলে বিস্ময় লাগে। এবং একার সংসারে এখনও আশার প্রদীপ নিয়ে কী করে আজও স্বপ্ন হাতড়ে বেড়ান, স্তম্ভিত হতে হয় দেখে!” তিনি নিমাই ঘোষকে অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং শক্ত মনের মানুষ হিসেবেও তুলে ধরেছেন। অভিনেতার সঙ্গে বসে তাঁর গল্প শুনে নিজেকে যেন কিছুটা নির্বাক শ্রোতা মনে হয়েছিল দেবশঙ্করের। মাঝে মাঝে নিজেরাও গল্পে যোগ দিয়েছেন। তাঁর কাছে এই আড্ডার সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল কোনও চাওয়া-পাওয়া ছাড়াই এমন সরল এবং আন্তরিকভাবে কথা বলার সুযোগ।

দেবশঙ্করের কথায়, “নিপাট, স্বার্থহীন, দেনাপাওনা-বিহীন এমন সরলরেখার আড্ডা দিতে আজ আর ক’জনের দেখা পাই।” তবে নিমাই ঘোষকে নিয়ে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্ট নিয়েও তাঁর আপত্তি রয়েছে। তাঁর দাবি, সেখানে অভিনেতার চরম অর্থকষ্ট এবং কাজ না পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেই পোস্ট দেখেই দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন। এমনকী নিমাই ঘোষকে আর্থিক সাহায্য করতে আগ্রহী মানুষদের জন্য তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্যও চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আগে নিজে গিয়ে অভিনেতার সঙ্গে দেখা করে পরিস্থিতি বুঝবেন। ‘চৌরঙ্গী’ পত্রিকার সম্পাদক শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে জানিয়েছিলেন, ওই ধরনের পোস্টের মধ্যে পুরো সত্যি নেই এবং ভিউজ বাড়ানোর উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

শুভঙ্কর নিয়মিত নিমাই ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন বলেও জানতে পারেন দেবশঙ্কর। এরপর তাঁর কাছ থেকেই নম্বর নিয়ে দেবনাথকে সঙ্গে করে নিমাইদার বাড়িতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু তাঁদের যাওয়ার আগেই আরও একটি ঘটনা ঘটে। দেবশঙ্করের দাবি, আর এক ব্যক্তি ফেসবুকে নিমাই ঘোষের নামে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সম্প্রতি নিমাই ঘোষ স্নেহভাজন সোহমের উদ্যোগে প্রকাশিত একটি ভিডিও নিয়েও অভিনেতা নিজের বক্তব্য জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন দেবশঙ্কর। দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের দেখা অনুযায়ী, নিমাই ঘোষ এখনও কাজ করেন এবং কাজ পান। প্রায় ২০০টি ছবিতে এবং হয়তো ১০০টি নাটকে অভিনয় করা এই অভিনেতার আরও চারটি ছবি বর্তমানে মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ ইতিমধ্যেই পরপারে পাড়ি দিয়েছেন ঠাকুমা, নাতনিকে শেষবার দেখার ইচ্ছেটাও পূরণ হয়নি! বিগ বসের ঘরে ক্যামেরার সামনে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন নন্দিনী, বাবা-মাকে দিলেন কোন বিশেষ নির্দেশ?

তাই তাঁর সবচেয়ে বড় সমস্যা যে শুধুই অর্থকষ্ট, বিষয়টি এমন নয় বলেই জানিয়েছেন দেবশঙ্কর। বরং এই বয়সে তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় অভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে সঙ্গহীনতা এবং বয়সের সঙ্গে আসা স্বাভাবিক কিছু সমস্যার মোকাবিলা। তাই সাহায্যের নামে শুধু টাকা পাঠানোর বদলে তাঁর সঙ্গে সময় কাটানো, গল্প করা, তাঁর ভাবনা শোনা এবং নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি। দেবশঙ্করের কথায়, “এমন স্বর্ণখচিত মানুষকে ‘সঙ্গ’ দিন। নিঃস্বার্থ সঙ্গ। ওঁকে জেনে ওঁর ভাবনার দোসর হয়ে গল্প করুন। ওঁর খেয়াল রাখুন। খোঁজ রাখুন।” তাঁর এই বার্তা শুধু নিমাই ঘোষের জন্য নয়, তাঁর মতো আরও অনেক প্রবীণ শিল্পীর জন্যও। কারণ, একদিন আমাদেরও সেই বয়সে পৌঁছতে হবে!

You cannot copy content of this page