গতকাল রাতে সমাজ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রায় সবাইকে এক মিনিটের জন্য ভাবতে বাধ্য করেছিল। যেখানে ভ্লগার ‘সায়ক চক্রবর্তী’কে (Sayak Chakraborty) মধ্য কলকাতার স্বনামধন্য রেস্তোরাঁ ‘অলিপাব’ মটনের বদলে ‘গ’রুর মাং’স’ খাইয়ে দেয় না জানিয়েই! তাঁর এই অভিজ্ঞতা আসলে শুধু একটি ভুল অর্ডারের গল্পে আটকে থাকেনি। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিষয়টি দ্রুত অন্য খাতে গড়াতে শুরু করে। খাবার সংক্রান্ত অসতর্কতা থেকে আলোচনা গিয়ে ঠেকে বিশ্বাস, পরিচয় আর ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্নে। সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ক্লিপ দেখে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
আবার অনেকে প্রশ্ন তোলেন, একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কি এতটা বড় সামাজিক বিতর্কের রসদ হয়ে উঠতে পারে? ঠিক এই জায়গাতেই ঘটনাটি ব্যক্তিগত পরিসর ছেড়ে রাজ্যজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। এই ঘটনার রেশ রাজ্য রাজনীতিতেও পড়ে। বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ নিজেদের মতো করে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে, কোথাও এটি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বলে চিহ্নিত হয়, আবার কোথাও বলা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে মূল ঘটনাটির চেয়ে তার প্রতিক্রিয়াই বেশি জোরালো হয়ে ওঠে।
সায়কের নাম জড়িয়ে পড়ে একাধিক বিতর্কে, যার অনেকটাই তাঁর বক্তব্যের বাইরের ব্যাখ্যা ও অনুমানের ওপর দাঁড়ানো। এই আবহেই অভিনেতা নিজে সামনে এসে আর একটি ভিডিও পোস্ট করেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, কোনওভাবেই তিনি সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করতে চাননি বা ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টিকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেননি। তাঁর দাবি ছিল, খাবার নিয়ে এমন গাফিলতি যে কারও সঙ্গেই হতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। সেই কারণেই তিনি বিষয়টি চেপে না রেখে প্রকাশ্যে এনেছেন।
শুধু ভিডিও করেই থেমে থাকেননি, ঘটনার পর তিনি নিজে গিয়ে পার্ক স্ট্রিট থানায় অভিযোগ দায়ের করেন, যার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতারও হয়। সায়কের আরও বক্তব্য, রেস্তোরাঁর কর্মীদের আচরণে এমন এক ধরনের নির্লিপ্ততা ছিল, যা দেখে তাঁর মনে হয়েছে এর আগেও হয়তো এমন ঘটনা ঘটেছে। তিনি কাউকে হেয় করতে চাননি, বরং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ভুল আর না হয়, সেটাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের পছন্দ-অপছন্দ ও বিশ্বাসকে গুরুত্ব দেওয়া যে কোনও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।
আইনি পথে যাওয়ার সিদ্ধান্তও তিনি নিয়েছেন সেই দায়বদ্ধতার কথাই মাথায় রেখে। তবে এত কিছুর পরেও বিতর্ক থামেনি। সমাজ মাধ্যমে একাংশের মত, যে রেস্তোরাঁয় গরুর মাংস পরিবেশন হয় সেখানে গিয়ে এই ধরনের পরিচয়ভিত্তিক ক্ষোভ দেখানো অযৌক্তিক। তারা বলছেন, “যেখানে গ’রুর মাং’স পাওয়া যায়, সেখানে গিয়ে অযথা ব্রাহ্মণত্ব প্রতিষ্ঠা করার কোন মানে হয় না! হয় আপনার নিরামিষ খাওয়া উচিত বাইরে, না হলে খাওয়াই উচিত না এতই ব্রাহ্মণত্বের চিন্তা থাকলে।”
আরও পড়ুনঃ “একটা হিন্দু ব্রাহ্মণ বাড়ির ছেলেকে আপনি ‘গো মাতা’ খাইয়ে দিলেন না বলে!” মটনের পরিবর্তে, না জানিয়ে সায়ককে দেওয়া হলো ‘গ’রুর মাং’স’! ধর্মীয় সংবেদনশীলতা উপেক্ষায় চাপে অলিপাব রেস্তোরাঁ! ‘মুসলিম’ ওয়েটারের দায়িত্বহীনতা ঘিরে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়লেন অভিনেতা!
আবার অন্যপক্ষের অভিযোগ, কনটেন্ট তৈরির জন্য বিষয়টিকে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। ধর্মীয় পরিচয় টেনে আনা হয়েছে অপ্রয়োজনীয়ভাবে! “বলছে এক্সট্রা ‘বি’ফ স্টেক’ এমনিই দিয়ে গেছে। বাপের জন্মে কোন দোকান, কাউকে একটা নকুলদানা এক্সট্রা খাওয়াবে না, স্টেক তো অনেক দূরের কথা।” সমর্থকদের দাবি, কারও অজান্তে তার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কিছু ঘটলে প্রতিবাদ করাটা স্বাভাবিক। এই টানাপোড়েনেই ঘটনাটি আজও আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রে, যেখানে প্রশ্নটা শুধু একটি খাবারের নয় বরং দায়িত্ব, সংবেদনশীলতা আর সীমারেখা কোথায় টানা উচিত সেটাই।






