সেই ঘটনার ছায়াতেই তৈরি ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘দহন’!” — দাবি সাংবাদিক অনন্যা চক্রবর্তীর! তবে কি সত্যিটা চাপা দিতে চেয়েছিল প্রভাবশালীরা? লালবাতি এলাকার বাস্তবতা টেনে নারীর স্বাধীনতা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন তাঁর

বিনোদনের জগতে আমরা যেসব গল্প দেখি, তার বেশিরভাগই দর্শকদের জন্য সাজানো নাটকীয় মুহূর্ত। সিনেমার পর্দায় প্রতিবাদ, সাহস বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইকে অনেক সময় প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু সেই গল্পগুলোর পেছনে যে বাস্তব মানুষ, তাদের জীবনে কী ধরনের ঝড় বয়ে যায়—তা খুব কমই সামনে আসে। অনেক সময় দেখা যায়, সিনেমার গল্প শেষ হয়ে গেলেও বাস্তবের লড়াই তখনও শেষ হয় না। কলকাতার নব্বইয়ের দশকের একটি ঘটনা এমনই এক বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়, যা পরে সিনেমার গল্প হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই ঘটনার পর্দার বাইরের অভিজ্ঞতা ছিল অনেক বেশি তীব্র, অনেক বেশি অস্বস্তিকর।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক অনন্যা চক্রবর্তী তার ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে কর্মজীবনের নানা বিতর্কিত অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি শুধু অতীতের ঘটনার কথা বলেননি, বরং সমাজ, প্রশাসন, নারী নিরাপত্তা এবং বর্তমান শিক্ষাঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়েও সরব হয়েছেন। তার কথায় উঠে এসেছে প্রতিবাদ করার মূল্য, প্রশাসনিক উদাসীনতা, নারী নির্যাতনের বাস্তব চিত্র এবং সমাজের এমন কিছু দিক, যা অনেক সময় প্রকাশ্যে আসে না। সেই কারণেই তার বক্তব্য এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

অনন্যা জানান, নব্বইয়ের দশকে কলকাতার রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনে এক তরুণীকে নিগ্রহের হাত থেকে বাঁচাতে তিনি একাই প্রতিবাদ করেছিলেন। সেই ঘটনার অভিঘাত এতটাই গভীর ছিল যে পরে পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ সেই সত্য ঘটনার অনুপ্রেরণায় তৈরি করেন সিনেমা “দহন”। কিন্তু বাস্তবে প্রতিবাদ করার পর তার জীবন সহজ ছিল না। তিনি দাবি করেন, সেই সময় তাকে এবং তার পরিবারকে এমন মানসিক চাপে রাখা হয়েছিল যাতে তারা আইনি প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যান। তার কথায়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে অনেকেই যেন চাইছিলেন ঘটনাটি চাপা পড়ে যাক।

এরপরেই, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী হিসেবে তিনি জানান, তার ছাত্রজীবনের স্মৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমানে র‍্যাগিং বিতর্ক এবং ছাত্র মৃত্যুর ঘটনাগুলো তাকে হতাশ করেছে। তার মতে, শিক্ষাঙ্গনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি স্পষ্টই বলেন, তার সময়ে যদি এমন অন্যায় ঘটত, তিনি একাই প্রতিবাদে নামতেন। পাশাপাশি সাংবাদিকতা এবং শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি সমাজের এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হয়েছেন। পাচার হওয়া মেয়েদের উদ্ধারের সময় তিনি দেখেছেন, অনেক নারী ঘরোয়া হিংসা থেকে পালিয়ে লালবাতি এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। কারণ তাদের কাছে সেই অন্ধকার জীবনও অনেক সময় বাড়ির অত্যাচারের চেয়ে সহনীয় মনে হয়।

আরও পড়ুনঃ ফের বাংলায় হেন’স্থার মুখে গায়ক! কৃষ্ণনগরে অপ্রী’তিকর অভিজ্ঞতার শিকার গায়ক শিলাজিৎ!

নারীদের রাতের শহরে চলাফেরা নিয়ে সমাজের একাংশের আপত্তিকেও তিনি কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তার মতে, রাত ১১টার পর মেয়েদের বাইরে বের হওয়া নিয়ে বিধিনিষেধ চাপানো সমস্যার সমাধান নয়। বরং প্রশাসনের দায়িত্ব হওয়া উচিত নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এমনকি তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি পুরনো মন্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন—যদি নেত্রী নিজে রাতে বাইরে যেতে পারেন, তবে অন্য নারীদের ক্ষেত্রে বাধা কেন? অনন্যার মতে, নারীদের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করার বদলে সমাজকে বদলানোই এখন সবচেয়ে জরুরি। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, পর্দার গল্পের মতো বাস্তব জীবনেও প্রতিবাদের সাহস এখনও অত্যন্ত প্রয়োজন।

You cannot copy content of this page