হাসি, গল্প আর গভীর চিন্তাভাবনার মধ্যেই যিনি মানুষকে ছুঁয়ে যেতেন, সেই মানুষটিই আজ আর নেই, এই বাস্তবটা যেন এখনও মেনে নিতে পারছেন না কেউ। টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় (Rahul Arunoday Banerjee)এর অকাল মৃত্যু শিল্পী মহল থেকে সাধারণ দর্শক সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কয়েকদিন আগেও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, পডকাস্টে গল্প, ধারাবাহিকের শুটিং, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন অভিনেতা। তাই হঠাৎ এই চলে যাওয়া যেন আরও বেশি প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে। কী এমন ঘটেছিল? কী ছিল তার জীবনের অজানা দিক? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই ফিরে দেখা হচ্ছে তার শেষ সাক্ষাৎকারের কথাগুলো।
মৃত্যুর আগে এক খোলামেলা পডকাস্টে নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় নিয়ে অকপটে কথা বলেছিলেন রাহুল। তিনি স্বীকার করেছিলেন, এক সময় তিনি মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তার কথায়, “আমি সাফল্যও হ্যান্ডেল করতে পারিনি, আবার ব্যর্থতাও ঠিকভাবে নিতে পারিনি। সেই সময় ড্রাগ আমার জীবনে একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।” এই স্বীকারোক্তি শুধু সাধারণ নয়, বরং একজন সফল অভিনেতার ভেতরের ভাঙন কতটা গভীর হতে পারে, তারও ইঙ্গিত দেয়। তিনি বুঝিয়েছিলেন, বাইরের চাকচিক্যের আড়ালে কতটা অস্থিরতা লুকিয়ে থাকতে পারে।
রাহুলের কথায়, নেশার শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ বন্ধুমহলের প্রভাব এবং সহজলভ্যতা থেকেই প্রথমে ব্যাপারটা শুরু হয়। “ছোট ছোট জিনিস দিয়ে শুরু হয়, তারপর সেটা বাড়তে থাকে,”। প্রথমে যেটা সামান্য মনে হয়েছিল, সেটাই ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তিনি আরও বলেন, “একসময় দু একটা নেশার জিনিসে কাজ হতো না, তিনটে লাগত, তারপর আরও বাড়তে থাকত।” এই নির্ভরতা মানুষকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে বিচারবোধ প্রায় কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তার মতে, অনেক মানুষ এই নেশার কারণে চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায় যেখানে নিজের সত্তাকেও হারিয়ে ফেলে।
তবে এখানেই থেমে থাকেননি রাহুল। জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নেন এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “কেউ যদি তোমাকে ছাড়াতে চায়, তুমি বারবার রিল্যাপস করবে। এটা নিজের সিদ্ধান্ত না হলে সম্ভব নয়।” কোনও রিহ্যাব (rehabilitation) নয়, সম্পূর্ণ নিজের মানসিক শক্তি দিয়েই তিনি এই লড়াই জিতেছিলেন। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে বলেন, “১০-১২ দিন বিছানা থেকে উঠতে পারিনি, শরীর কাঁপত, ভয়ংকর সময় ছিল।” এই কঠিন সময়ে তার পাশে ছিলেন স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার, পরিবার এবং কাছের মানুষরা। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা ছিল একান্তই তার নিজের, নিজেকে বাঁচানোর জন্য।
রাহুলের জীবনে মোড় ঘোরানোর মুহূর্তটা ছিল খুব বাস্তব। তিনি বলেন, “আমি আমার মেন্টাল ব্যালেন্স দেখতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু ব্যাংক ব্যালেন্স কমে যাচ্ছে সেটা দেখতে পাচ্ছিলাম।” এই উপলব্ধিই তাকে বিব্রত করে তুলেছিল। একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হিসেবে তিনি বুঝেছিলেন, যা কিছু অর্জন করেছেন, সবটাই মানুষের ভালোবাসায়। তাই সেই সব হারানোর ভয়ই তাকে নেশা ছাড়ার শক্তি দেয়। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন “আমি কেন নেশা করছি?” আর সেই প্রশ্নের উত্তরই তাকে ফিরিয়ে আনে বাস্তবের মাটিতে। নেশা ছাড়ার পর জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন রাহুল। তিনি বলেন, “আমার কোনো রিগ্রেট নেই।
যা হয়েছে, সবই আমাকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে।” ব্যর্থতা, সমালোচনা,ট্রোল সবকিছুকে তিনি গ্রহণ করতে শিখেছিলেন। তার মতে, একজন শিল্পীর জীবনে কোনও অভিজ্ঞতাই বৃথা যায় না। প্রতিটি ভুল, প্রতিটি কঠিন সময় তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এই মানসিকতা তাকে নতুনভাবে কাজের প্রতি মনোযোগী হতে সাহায্য করেছিল। আজ তার সেই কথাগুলোই যেন আরও বেশি করে মনে করিয়ে দেয় একজন শিল্পীর জীবনে আলো আর অন্ধকার পাশাপাশি চলে। বাইরে থেকে যাকে সফল মনে হয়, তার ভেতরেও চলতে পারে গভীর লড়াই। অভিনেতার এই অকপট স্বীকারোক্তি শুধু ব্যক্তিগত গল্প নয়, বরং এক বড় সামাজিক বার্তা। বর্তমানে তাকে ঘিরে রয়ে গেছে অনেক প্রশ্ন, তার মৃত্যু কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনও সত্য? সেই উত্তরই এখন খুঁজছে গোটা টলিউড এবং তার অসংখ্য অনুরাগী।






