দীর্ঘদিন ধরেই বাংলার চলচ্চিত্র জগতের একাংশ অভিযোগ করে এসেছে, কয়েক বছরে রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে টলিউডের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূল সরকারের আমলে ইন্ডাস্ট্রির একাংশ শিল্পী বারবার অভিযোগ তুলেছেন যে, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা না থাকলে কাজ পাওয়া, সুযোগ তৈরি হওয়া কিংবা পুরস্কারের মঞ্চে স্বীকৃতি পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছিল। একসময়ের সম্মানীয় বাংলা সিনেমা আজ দর্শক হারিয়ে ধুঁকছে বলেও মত অনেকের। বন্ধ হয়ে গিয়েছে একের পর এক সিঙ্গল স্ক্রিন হল, কমেছে সাধারণ দর্শকের হলমুখী হওয়ার প্রবণতা। আর এই আবহেই নন্দনে বসে রূপা গঙ্গোপাধ্যায় ও রুদ্রনীল ঘোষের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে সামনে এনে বিস্ফোরক পোস্ট করলেন অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র।
অভিনয়ের পাশাপাশি বরাবরই স্পষ্টভাষী হিসেবে পরিচিত শ্রীলেখা মিত্র। সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক বিভিন্ন ইস্যুতে নিজের মত প্রকাশ করতে কখনও পিছিয়ে থাকেননি তিনি। বহুবার ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের অসঙ্গতি নিয়ে সরব হয়েছেন। কখনও কাস্টিং নিয়ে পক্ষপাতিত্ব, কখনও রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে শিল্পীদের বিভাজন এসব বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রতিবাদ করেছেন অভিনেত্রী। শুধু সোশ্যাল মিডিয়াতেই নয়, একাধিক সাক্ষাৎকারেও তিনি দাবি করেছেন, টলিউডে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের ‘লবি সংস্কৃতি’ কাজ করছে। সেই কারণেই অনেক প্রতিভাবান শিল্পী প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য, শিল্পের জায়গায় রাজনীতি ঢুকে পড়ায় বাংলা সিনেমার সৃজনশীল পরিবেশ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
নিজের সাম্প্রতিক পোস্টে শ্রীলেখা মূলত রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এবং রুদ্রনীল ঘোষের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে টলিউডে তথাকথিত দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে কড়া সুর চড়ান। তিনি লেখেন, টালিগঞ্জে ‘ব্যান’, ‘বয়কট’ বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দাপটের সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া দরকার। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করেন পরিচালক বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কাঁটাতার’ ছবির কথা, যে ছবির জন্য তিনি বিএফজেএ-র শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গ টেনেই অভিনেত্রী প্রশ্ন তোলেন বর্তমান সময়ে পুরস্কার নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে। তাঁর দাবি, একসময় যে বাংলা সিনেমা শিল্পগুণের জন্য পরিচিত ছিল, সেখানে এখন রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ও ব্যক্তিগত লবির প্রভাব বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে শ্রীলেখার সেই অংশ নিয়ে, যেখানে তিনি সরাসরি শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়কে ঘিরে প্রশ্ন তোলেন। পোস্টে তিনি লেখেন, “শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পুরস্কৃত শ্রীলেখাকে ফেলে, ‘গৃহপ্রবেশ’ নামক একটি নিম্নমানের গাঁজাখুরি ছবিতে চতুর্থশ্রেণীর অভিনয়ের জন্য বারাকপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক রাজ চক্রবর্তীর স্ত্রী শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় ঠিক কীভাবে সেরা অভিনেত্রীর WBFJA পুরস্কার পায় তা জানতে চাই?” এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। একাংশ নেটিজেন শ্রীলেখার বক্তব্যকে সাহসী বলে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, পুরস্কার নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার একজন শিল্পীর থাকতেই পারে। আবার অন্য একটি অংশ মনে করছে, ব্যক্তিগত আক্রমণের সুরে করা এই মন্তব্য অত্যন্ত অপমানজনক এবং অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক উসকে দিচ্ছে।
শুধু পুরস্কার বিতর্কই নয়, শ্রীলেখা তাঁর পোস্টে টলিউডের তথাকথিত ‘চাটুকার সংস্কৃতি’ নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির শিল্পী শুধুমাত্র রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণে সুযোগ পেয়ে গিয়েছেন, আর বাকিরা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তিনি আরও লেখেন, সাধারণ দর্শক এখন আর একই মুখের একঘেয়ে অভিনয় দেখতে চান না। তাই টলিউডকে বাঁচাতে গেলে নতুন শিল্পীদের সুযোগ দেওয়া, সুস্থ কর্মসংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা এবং সিঙ্গল স্ক্রিন হলগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি। শ্রীলেখার মতে, সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত দর্শকদের আবার হলমুখী করতে না পারলে বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ আরও সংকটে পড়বে।
আরও পড়ুন: তৃণমূলী দাদাগিরি! বিশ্বাস ব্রাদার্সের চক্রা’ন্ত, হেন’স্থার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন কর্মহীন ‘ধন্যি মেয়ে’ থেকে শুরু করে একাধিক জনপ্রিয় ধারাবাহিকের প্রযোজক! বিস্ফো’রক অভিযোগ অতনু রায়ের
এই পোস্ট প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই টলিউডে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা। যদিও শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় বা রাজ চক্রবর্তীর তরফে এখনও পর্যন্ত এই মন্তব্য নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরেই বিষয়টি নিয়ে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে টলিউডের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবার প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে গঠনমূলক আলোচনাই ইন্ডাস্ট্রির জন্য বেশি প্রয়োজন। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট শ্রীলেখা মিত্রের এই বিস্ফোরক পোস্ট ফের সামনে এনে দিল টলিউডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পুরস্কার রাজনীতি এবং বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন।






