শেষ ছবির পর আর বাঁচতে চাননি? রহস্যমৃ’ত্যুর পর অনীক দত্তর ঘর থেকে উদ্ধার আ’ত্মহ’ত্যার চিঠি ঘিরে তোলপাড়! মৃ’ত্যুর আগে কী লিখে গেলেন পরিচালক? আদৌও কি ওনারই হাতের লেখা? তদন্তে তৎপর বিশেষজ্ঞরা!

বুধবার দুপুরে আচমকাই টলিপাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে এক চাঞ্চল্যকর খবর। গড়িয়াহাটের বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর জখম হন পরিচালক অনীক দত্ত। তড়িঘড়ি তাঁকে ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই শোকের ছায়া নামে গোটা বাংলা চলচ্চিত্র জগতে। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর পরিচালক মাত্র ৬২ বছর বয়সেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তবে এই মৃত্যুকে ঘিরে ইতিমধ্যেই উঠতে শুরু করেছে একাধিক প্রশ্ন। কীভাবে তিনি ছাদ থেকে পড়লেন, তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। এরই মধ্যে সামনে এসেছে এক নতুন তথ্য, যা ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।

বাংলা সিনেমায় অনীক দত্ত নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন বহু আগেই। ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নরেন্দ্রচন্দ্র দত্তের পৌত্র হয়েও তিনি কর্পোরেট জগত ছেড়ে সিনেমাকেই নিজের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। বিজ্ঞাপনের দুনিয়া থেকে এসে বাংলা ছবিতে ব্যঙ্গ, রসবোধ আর সামাজিক বক্তব্যের এক অন্যরকম মিশেল এনেছিলেন তিনি। মাত্র আটটি ছবির ফিল্মোগ্রাফি হলেও প্রতিটি কাজ দর্শকের মনে দাগ কেটেছিল। ২০১২ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ মুক্তির পর থেকেই পরিচালক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। পরে ‘আশ্চর্য প্রদীপ’, ‘মেঘনাদবধ রহস্য’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ এবং সত্যজিৎ রায়কে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি ‘অপরাজিত’ তাঁকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। তাঁর ছবিতে মধ্যবিত্ত সমাজ, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ আর তীক্ষ্ণ সংলাপ সবসময় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তির অপেক্ষায় ছিল তাঁর শেষ ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’। সেই সময় থেকেই শরীর খারাপ এবং টলিউডের পরিস্থিতি নিয়ে বারবার হতাশার কথা বলতে শোনা গিয়েছিল তাঁকে। অভিনেতা জিতু কমলের সঙ্গে দূরত্ব এবং ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়েও তিনি প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন। একাধিক সাক্ষাৎকারে অনীক দত্ত বলেছিলেন, “শারীরিক অসুস্থতার কারণে শুটিংয়ে থাকতে না পারাটা অত্যন্ত যন্ত্রণার। শরীর যেভাবে অবনতি হচ্ছে, তাতে মনে হয় না আর নতুন করে ছবি বানাতে পারব। এটাই হয়তো আমার শেষ ছবি।” সেই সময় অনেকেই কথাগুলোকে সাময়িক হতাশা বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর সেই মন্তব্যগুলো ফের নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। অনেকের কাছেই মনে হচ্ছে, যেন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগাম কোনও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন পরিচালক।

ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই মানসিকভাবে ভীষণ চাপে ছিলেন অনীক দত্ত। তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, মুম্বইয়ের বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাজ ছেড়ে শুধুমাত্র ভাল বাংলা সিনেমা তৈরির স্বপ্ন নিয়েই কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টলিউডের দলাদলি, কাজের ক্ষেত্রে অসহযোগিতা এবং নানা অপমান তাঁকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সেই হতাশার ইঙ্গিতও মিলেছে। তাঁর মতে, সৃজনশীল কাজের পরিবেশ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছিল। অনেকেই মনে করছেন, ব্যক্তিগত হতাশা এবং শারীরিক সমস্যার চাপ একসঙ্গে তাঁকে ভেঙে দিচ্ছিল। যদিও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে নারাজ পুলিশ। তবে গোটা ঘটনায় রহস্য আরও বেড়েছে একটি বিশেষ তথ্য সামনে আসার পর।

আরও পড়ুনঃ “এটাই হয়তো আমার শেষ…” মৃ’ত্যুর কয়েক মাস আগেই ভয়ংকর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন অনীক দত্ত! পরিচালকের শেষ ভবিষ্যদ্বাণী কী ছিল? রহস্যে মোড়া মৃ’ত্যু নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন!

সূত্রের খবর, অনীক দত্তর মৃত্যুর পর তাঁর বাড়ি থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়েছে। সেখানে নাকি লেখা ছিল, তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে টলিউডে। যদিও পুলিশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পুরো বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তদন্তকারীরা নোটটি খতিয়ে দেখছেন বলেই জানা গিয়েছে। পাশাপাশি এটি সত্যিই পরিচালকের লেখা কি না, তাও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। অনীক দত্তর মৃত্যু দুর্ঘটনা, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে, সেই উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তবে তাঁর শেষ লেখা ঘিরে রহস্য আরও গভীর হয়েছে। বাংলা সিনেমার এক গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতার এমন আকস্মিক মৃত্যুতে এখনও শোকস্তব্ধ টলিউড।

You cannot copy content of this page