রবিবার গভীর রাতে যাদবপুর স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় হঠাৎ শুরু হয় উচ্ছেদ অভিযান। রেলের জমিতে দীর্ঘদিন ধরে থাকা একাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকান এবং নির্মাণ ভাঙার উদ্দেশ্যে বুলডোজার নিয়ে অভিযান চালানো হয়। রাতের অন্ধকারে শুরু হওয়া এই পদক্ষেপ ঘিরে মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। স্থানীয় ব্যবসায়ী, বাসিন্দা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানান। পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে এবং স্টেশন চত্বর জুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। উচ্ছেদ ঘিরে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তে থাকে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়।
উচ্ছেদ অভিযানের সময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পরিস্থিতিও তৈরি হয়। অভিযোগ, আন্দোলনকারীরা উচ্ছেদ ঠেকানোর চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এই ঘটনায় বাম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য-সহ একাধিক আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়। পাশাপাশি নাট্যকর্মী জয়রাজ ভট্টাচার্য আহত হন বলে জানা যায়। তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে বলেও খবর সামনে আসে। গোটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহল থেকে সাংস্কৃতিক জগৎ পর্যন্ত নানা মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সামাজিক মাধ্যমেও এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
এই ঘটনার পর অভিনেতা ঋদ্ধি সেন নিজের সামাজিক মাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্ট করেন। সেখানে তিনি প্রশাসনের ভূমিকা এবং উচ্ছেদ অভিযানের পদ্ধতি নিয়ে সরব হন। নিজের পোস্টে ঋদ্ধি লেখেন, “গতকাল রাতের ঘটনার পর আর যাই হোক কেউ ‘পরিবর্তন’ শব্দটা ব্যবহার করবেন না, নাগরিকদের শরীরের রক্ত ঝরিয়ে, রাতের অন্ধকারে বন্দুক, লাঠি, বুলডোজার দিয়ে ঘিরে ধরে নাগরিকদের প্রতিবাদ, কর্মস্থল এবং মানবিক অধিকার গুঁড়িয়ে দিয়ে উন্নয়ন আনার কথা বলে যে রাজনীতি সেই রাজনীতি ভয়াবহ, অমানবিক।” এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে নেটমাধ্যমে। অনেকেই তাঁর বক্তব্য নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। রাজনৈতিক মহলেও তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।
ঋদ্ধি আরও লেখেন, “এটাকে যারা উন্নয়ন বলছেন এবং বলবেন তাঁরা কোনো ভয়মুক্ত ‘পরিবর্তন’ চান না, তাঁরা নিজের সহ নাগরিকের শরীর থেকে ঝরা রক্ত আর কান্নার ওপর দাঁড়িয়ে উন্নয়ন চান।” তাঁর মতে, উন্নয়নের নামে যদি মানুষের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। পোস্টে তিনি আরও বলেন, “পরিবর্তনের অর্থ একটাই, রাজনৈতিক আগ্রাসনের ব্র্যান্ড পরিবর্তন।” একই সঙ্গে তিনি ব্যঙ্গাত্মক সুরে লেখেন, “হাততালি দিন, এই আগ্রাসন উদযাপন করুন, মানুষের যন্ত্রণা, রক্ত দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলুন, সব ঠিক আছে, কারণ আপনার পছন্দের ব্র্যান্ডর আগ্রাসন ঘটলে কোনো ক্ষতি নেই।” এই অংশটিই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ “তানপুরার সুর মেলাতেই শরীরের ভেতরে যেন বিদ্যুৎ মত কিছু একটা হয়ে গেল” আশীর্বাদ না থাকলে গলায় ‘সা’ আসবে না! সংগীত সাধনায় কোন গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার কথা জানালেন হৈমন্তী শুক্লা?
পোস্টের শেষ দিকে অভিনেতা সমাজে ‘সিলেকটিভ নৈতিকতা’ বা বেছে বেছে নৈতিকতার প্রসঙ্গও তোলেন। তাঁর কথায়, “আপনার পছন্দের জূজূ ভয় দেখালে সব কিছু মাফ, অগণতান্ত্রিক কাজের প্রতিবাদ করলে আপনার পছন্দের প্রশাসন নাগরিকদের লাঠির বাড়ি মারলে সেটা গণতান্ত্রিক, পৃথিবীর সবকিছুই আসলে সিলেকটিভ, সিলেকটিভ নৈতিকতা বুকে নিয়ে সিলেকটিভ পরিবর্তন উদযাপন করুন।” ঋদ্ধির এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর যাদবপুরের ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। উন্নয়ন এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য কোথায় থাকা উচিত, সেই প্রশ্নও আবার সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক মহলের একাংশও বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করতে শুরু করেছেন।






