অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে পৌঁছেছিলেন শিশিরকুমার ভাদুড়ির দরজায়, প্রথম সাক্ষাতেই তাঁকে কী বলেছিলেন নাট্যাচার্য? পাঁচ দশকের অভিনয় জীবন, আজ আর্থিক লড়াই করে ভাঙাচোরা ঘরে দিন কাটিয়েও, জীবনের মোড় ঘোরানো কোন সেই স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন প্রবীণ অভিনেতা নিমাই ঘোষ?

বাংলা বিনোদন জগতের ইতিহাসে প্রবীণ অভিনেতাদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের নিষ্ঠা, পরিশ্রম এবং শিল্পচর্চার মধ্য দিয়েই সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের পরিসর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি, অভিনয়শৈলী এবং দর্শকের রুচিতে বহু পরিবর্তন এলেও এই শিল্পীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও প্রতিভার মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন। তাঁদের জীবনের নানা সংগ্রাম, শিল্পের প্রতি নিবেদন এবং অদম্য ভালোবাসা আজও নতুন শিল্পীদের কাছে শিক্ষণীয়। সেইসব বর্ষীয়ান শিল্পীদের অন্যতম হলেন অভিনেতা নিমাই ঘোষ, যিনি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলা অভিনয় জগতের এক পরিচিত ও সম্মানিত মুখ।

বাংলা থিয়েটার, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র জগতে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় রয়েছেন নিমাই ঘোষ। কর্মজীবনে তিনি ২০০-রও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং অসংখ্য বৈচিত্র্যময় চরিত্রে নিজের অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যা এবং আর্থিক প্রতিকূলতার খবর মাঝেমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনও কমেনি। এখনও তিনি সমান উৎসাহ নিয়ে কাজ করে চলেছেন। সম্প্রতি পাভেল পালের পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘Only Silence Remains’ বা ‘কারুবাসনা’-তে ‘কুঞ্জবিহারী পাল’ নামের এক মূক চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছে। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চাতেও সমানভাবে যুক্ত। কয়েক বছরের সঞ্চিত লেখার ভিত্তিতে তাঁর কবিতার বই ‘পথিকবর দাঁড়াও’ প্রকাশিত হয়েছে, যা তাঁর সৃজনশীলতার আরেকটি পরিচয় বহন করে।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতির কথা তুলে ধরেছেন নিমাই ঘোষ। তিনি জানান, ছাত্রাবস্থায় বাংলা নাট্যজগতের কিংবদন্তি নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ থেকেই তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেই সময় অভিনয়ের প্রতি প্রবল আগ্রহে তিনি শিশির ভাদুড়ির কাছে থিয়েটারে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু প্রত্যাশার বিপরীতে নাট্যাচার্য তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে দলে নেওয়ার পরিবর্তে প্রথমেই জানতে চান তিনি তখনও পড়াশোনা করছেন কি না। নিমাই ঘোষ জানান, তিনি তখন স্কুলের ছাত্র। সেই উত্তর শোনার পর শিশির ভাদুড়ি তাঁকে অভিনয়ের চেয়ে আগে পড়াশোনার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন।

নিমাই ঘোষের কথায়, সেই সময় থিয়েটারের জগতে প্রবেশ করতে হলে সাহিত্য সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করা হতো। নাট্যচর্চার সঙ্গে পড়াশোনার সম্পর্ক ছিল অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই শিশির ভাদুড়ি তাঁকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে আগে শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে হবে, তারপর অভিনয়ের কথা ভাবা উচিত। তরুণ নিমাই ঘোষের কাছে সেই উপদেশ প্রথমে হতাশাজনক মনে হলেও পরবর্তীকালে তিনি উপলব্ধি করেন যে এটি তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে এবং শিল্পচর্চার পাশাপাশি জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে।

আরও পড়ুনঃ “ভোটে টিকিট পাওয়ার জন্য অভিনয় করতে হয় ?”, “দেব মেগাস্টার বলে ভিড় হতো, জননেতা হিসেবে নয়” টলিউডের তারকা-রাজনীতিদের একহাত নিলেন অভিনেত্রী মৌসুমী ভট্টাচার্য

পরে কোনোমতে স্কুলশিক্ষা সম্পূর্ণ করে নিমাই ঘোষ স্থানীয় একটি থিয়েটার দলে যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে বিখ্যাত নাট্যদল ‘নান্দিকার’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ধীরে ধীরে অভিনয় জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন তিনি এবং পরবর্তীকালে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেন-এর ছবিতেও অভিনয়ের সুযোগ পান। দীর্ঘ কর্মজীবনের এই পথচলায় শিশিরকুমার ভাদুড়ির সেই প্রাথমিক পরামর্শ যে তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তা আজও অকপটে স্বীকার করেন প্রবীণ অভিনেতা। তাঁর এই স্মৃতিচারণ কেবল একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্যও শিক্ষা, অধ্যবসায় এবং শিল্পের প্রতি নিষ্ঠার এক মূল্যবান বার্তা।

You cannot copy content of this page