‘চারুলতা’ থেকে ‘হীরক রাজার দেশে’, সত্যজিতের ছবিতে যাঁর অভিনয় বাঙালির স্মৃতিতে অমর! শেষে সেই অভিনেতাই পঙ্গু হয়ে অবহেলায় মা’রা যান! কামু মুখোপাধ্যায়ের এমন করুণ পরিণতির কারণ কী?

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু অভিনেতা থাকেন, যাঁদের মুখ নায়ক না হলেও দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে যায়। সেই তালিকাতেই অন্যতম নাম ‘কামু মুখোপাধ্যায়’ (Kamu Mukherjee), যাঁর আসল নাম ছিল কামাখ্যা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ১৯৩১ সালের ১৪ জুন তাঁর জন্ম। অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি ধীরে ধীরে বাংলা সিনেমার জগতে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে তিনি ‘কামু’ নামেই বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন। সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই তাঁর অভিনয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। ছোট ছোট চরিত্র দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে তিনি পরিচালকের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অভিনেতা হয়ে ওঠেন।

তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো দর্শকের মনে আজও জায়গা করে রয়েছে। সত্যজিৎ রায়ের একাধিক কালজয়ী ছবিতে অভিনয় করেছেন কামু মুখোপাধ্যায়। ‘চারুলতা’, ‘নায়ক’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘শাখাপ্রশাখা’ সহ বহু ছবিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি চরিত্রেই তিনি নিজের স্বাভাবিক অভিনয়ের মাধ্যমে আলাদা ছাপ ফেলেছেন। খুব বড় চরিত্র না হলেও তাঁর অভিনয় ক্ষমতা সহজেই নজর কাড়ত দর্শকদের। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর কাজ তাঁকে আরও বেশি পরিচিতি এনে দেয়।

সময়ের সঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন ইন্ডাস্ট্রির পরিচিত ও ভরসাযোগ্য একজন চরিত্রাভিনেতা। তবে তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র নিঃসন্দেহে ‘সোনার কেল্লা’ ছবির মন্দার বোস। ফেলুদা সিরিজের এই চরিত্রটি দর্শকদের কাছে আজও সমানভাবে জনপ্রিয়। ধূর্ত, চতুর এবং কখনও হাস্যরস মিশ্রিত এই চরিত্রকে তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর অভিনয়ের কারণেই মন্দার বোস বাংলা সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় খল চরিত্র হয়ে ওঠে। বহু বছর পরেও এই চরিত্র নিয়ে আলোচনা হয়। দর্শকদের কাছে এটি একটি কালজয়ী উপস্থাপনা হিসেবে থেকে গেছে। সেই সময় থেকেই তিনি আলাদা পরিচিতি পান।কিন্তু জীবনের শেষ দিকটা কামু মুখোপাধ্যায়ের জন্য খুব কঠিন হয়ে ওঠে। ১৯৯২ সালে সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে।

আরও পড়ুন: এবার অমিত শাহর দরবারে শতাব্দী! তৃণমূলে বেড়েছে অস্বস্তি, বিদ্রোহী তালিকায় কি জুড়ছে আরও বড় নাম? এবার মমতাকে চমকাবেন টলিপাড়ার নায়িকা?

ধীরে ধীরে সিনেমার কাজ কমতে থাকে। নতুন প্রজন্মের পরিচালকদের সঙ্গে তাঁর কাজের সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। একসময় যিনি নিয়মিত শুটিংয়ে ব্যস্ত থাকতেন, তিনি ধীরে ধীরে কাজের বাইরে চলে যান। অভিনয়ের সুযোগ কমে যাওয়ার ফলে তাঁর আয়ও কমতে শুরু করে। এই সময় থেকেই তাঁর জীবনে আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর পাশাপাশি শারীরিক সমস্যাও বাড়তে থাকে তাঁর। দীর্ঘদিন অসুস্থতার কারণে তিনি ধীরে ধীরে পঙ্গুত্বের দিকে চলে যান। হাঁটাচলা করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেক সময় তাঁকে শয্যাশায়ী অবস্থায় থাকতে হত। বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগও অনেকটাই কমে যায়।

একসময় যিনি স্টুডিও পাড়ার পরিচিত মুখ ছিলেন, তিনি ক্রমশ আড়ালে চলে যান। এই সময় তাঁর মানসিক অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে বলে জানা যায়। শিল্পীর জীবন ধীরে ধীরে একাকিত্বে ভরে ওঠে। অনেকেই মনে করেন, বাংলা সিনেমা তাঁকে যথাযথ সম্মান দিতে পারেনি। যে অভিনেতা একাধিক কালজয়ী ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, শেষ জীবনে তিনি অনেকটাই অবহেলিত ছিলেন। জনপ্রিয়তা থাকলেও তা তাঁর দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলি দূর করতে পারেনি। দর্শকের ভালোবাসা থাকলেও বাস্তব জীবন ছিল কঠিন ও কষ্টকর। শিল্পী হিসেবে তাঁর অবদান আজও স্বীকৃত। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল অবসাদ ও সংগ্রামে ভরা।

উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের ৬ ডিসেম্বর ৭২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কামু মুখোপাধ্যায়। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে বাংলা সিনেমা হারায় এক অনন্য চরিত্রাভিনেতাকে। তবে তিনি আজও বেঁচে আছেন তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর মাধ্যমে। বিশেষ করে ‘মন্দার বোস’ আজও দর্শকের মনে অমর হয়ে আছে। নায়ক না হয়েও কীভাবে একজন অভিনেতা দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেন, তার অন্যতম উদাহরণ হয়ে রয়ে গেছেন তিনি। আজও বাঙালির মননে তাঁর অভিনীত চরিত্ররা ঠিক আগের মতোই জীবন্ত।

You cannot copy content of this page