সোনা’গাছিতে এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন মহানায়ক, যা কেউ কল্পনাও করেননি! উত্তম কুমারকে হঠাৎ ২৫ টাকা দিয়েছিলেন এক পতি’তা! পাশে দাঁড়িয়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন বিকাশ রায়, কিন্তু কেন?

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু তারকা রয়েছেন, যাঁদের জনপ্রিয়তা সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে আজও মানুষের আবেগের অংশ হয়ে রয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মহানায়ক উত্তম কুমার। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করত, তেমনই বাস্তব জীবনেও তাঁকে একবার কাছ থেকে দেখার জন্য মানুষের উন্মাদনার শেষ ছিল না। সম্প্রতি অভিনেতা বিকাশ রায়ের একটি পুরনো সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে উঠে এসেছে এমনই এক ঘটনা, যেখানে ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে উত্তর কলকাতার সোনাগাছিতে মহানায়কের প্রতি মানুষের অগাধ ভালোবাসার এক বিরল ছবি ধরা পড়েছিল।

ঘটনাটি সত্তরের দশকের শুরুর দিকের। সে সময় ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল হাওড়া জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্র জগতের বিভিন্ন শিল্পীরা এগিয়ে আসেন দুর্গতদের সাহায্যের জন্য। বেঙ্গল মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ত্রাণের জন্য অর্থ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী শিল্পীরা দল বেঁধে শহরের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই একদিন বিকাশ রায় এবং উত্তম কুমার পৌঁছে যান উত্তর কলকাতার সোনাগাছি এলাকায়।

সেখানে পৌঁছতেই এক অন্যরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তাঁরা। মহানায়ককে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়ে এলাকার বহু মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ দূর থেকে প্রণাম জানান, কেউ আবার ভিড়ের মধ্যেই তাঁকে এক ঝলক দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। ত্রাণ তহবিলের জন্য অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি অনেকেই ফুল দিয়ে স্বাগত জানান প্রিয় অভিনেতাকে। বিকাশ রায় পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, তাঁরা এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে ত্রাণের জন্য অনুদান সংগ্রহ করছিলেন। সেই সময়ই ঘটে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা।

একটি বাড়িতে গিয়ে তাঁরা অনুদান সংগ্রহ করার সময় এক তরুণী এগিয়ে এসে প্রথমে কিছু অর্থ দেন। তারপর তিনি জানতে চান উত্তম কুমার কোথায় আছেন। বিষয়টি প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব না পেলেও পরে তাঁর অনুরোধ শুনে অবাক হয়ে যান বিকাশ রায়। ওই তরুণীর ইচ্ছা ছিল, তিনি যেন নিজের ঘরে একবার মহানায়ককে নিয়ে আসেন। তাঁর যুক্তি ছিল, জীবনে হয়তো আর কখনও এত কাছ থেকে প্রিয় নায়ককে দেখার সুযোগ মিলবে না। সেই আবেগ থেকেই তিনি আরও বেশি অর্থ দেওয়ার কথাও জানান।

পরিস্থিতির কথা উত্তম কুমারকে জানানো হলে তিনি সেই অনুরোধ ফিরিয়ে দেননি। বরং মানুষের আবেগের মূল্য দিয়ে তিনি ওই ঘরে প্রবেশ করেন। মহানায়ককে সামনে পেয়ে তরুণী আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে উত্তম কুমারকে প্রণাম করেন এবং নিজের সাধ্যমতো আরও অর্থ ত্রাণ তহবিলে দান করেন। তাঁর কথায়, প্রিয় অভিনেতাকে এত কাছ থেকে দেখতে পারাটাই ছিল জীবনের এক বড় স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আনন্দেই তিনি এমনটা করেছিলেন।

আরও পড়ুনঃ “একটা শিশুর জন্ম হচ্ছে, সে আগে…” আরজি কর কাণ্ডকে সামনে রেখে, এই দেশেই সন্তান আনার বিরোধিতা করেছিলেন তিনি! এবার মাতৃত্বের গুঞ্জনের মাঝেই বিরাট স্বীকারোক্তি সোহিনীর! সরকার বদলাতেই কি বদলালো পরিকল্পনা? কী জানালেন অভিনেত্রী?

এই ঘটনা শুধু একজন তারকার জনপ্রিয়তার গল্প নয়, বরং সেই সময়ের সমাজে উত্তম কুমারের প্রভাব কতটা গভীর ছিল, তারও এক অনন্য দলিল। পর্দার নায়ক হিসেবে তিনি মানুষের হৃদয়ে যে জায়গা তৈরি করেছিলেন, তা কেবল সিনেমা হলের চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ তাঁকে নিজেদের একজন বলে মনে করতেন। তাই ত্রাণ সংগ্রহের মতো মানবিক উদ্যোগেও তাঁর উপস্থিতি মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে এই ধরনের গল্প মহানায়কের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে এবং স্মরণ করিয়ে দেয়, কেন উত্তম কুমার আজও বাঙালির আবেগের অন্যতম বড় নাম।

You cannot copy content of this page