এক সময় বাংলা টেলিভিশনের অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ ছিলেন অভিনেতা জয়ন্ত দত্ত। ‘জননী’ ধারাবাহিকের রাজু চরিত্র থেকে শুরু করে নায়ক, খলনায়ক এবং পরবর্তীকালে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে দীর্ঘ পথচলা তাঁর। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান, টলিউডে রাজনীতির প্রভাব, শিল্পীদের ভূমিকা, কাজ না পাওয়ার বিতর্ক, তারকাখ্যাতির বাস্তবতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা অধ্যায় নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন তিনি। তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানকে প্রথমে স্বাগত জানালেও পরে হতাশ হওয়ার কথা যেমন জানিয়েছেন, তেমনই বাংলা বিনোদন জগতে রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্বজনপোষণ নিয়েও বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন অভিনেতা। পাশাপাশি প্রথম বিবাহ ভাঙার নেপথ্য কাহিনি ও দ্বিতীয়বার সংসার গড়ার অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নিয়েছেন তিনি।
জয়ন্ত দত্ত জানান, ছোটবেলায় বামপন্থী পরিবারে বড় হওয়ার কারণে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায়ও সেই প্রভাব ছিল। তবে দীর্ঘ বাম শাসনের পর পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেছিলেন। সেই কারণেই তৃণমূল ক্ষমতায় আসার সময় তিনি আশাবাদী ছিলেন। অভিনেতার কথায়, “লেফট গভর্নমেন্ট যে অত্যাচারটা করছিল, সেটা থেকে একটা রেহাই দরকার ছিল। ভালোই হলো তৃণমূল এলো। আমিও প্রথম দিকে ওদের সঙ্গে একটু-আধটু ছিলাম।” তিনি জানান, ২০১১ সালে কয়েকটি রাজনৈতিক সভাতেও অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর ধারণা বদলে যায়। “দু-তিন বছর পর থেকেই দেখলাম স্বজনপোষণ শুরু হয়েছে, পয়সার লেনদেন শুরু হয়েছে, গুন্ডামি শুরু হয়েছে। তখনই বুঝলাম তলায় তলায় ঠিক কাজ হচ্ছে না,” বলেই জানান তিনি।
টলিউডে রাজনীতির প্রভাব নিয়েও সরব হয়েছেন জয়ন্ত। তাঁর মতে, একসময় রাজনৈতিক দলগুলি বিনোদন জগতকে নিজেদের প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত না। কিন্তু পরে পরিস্থিতি বদলে যায়। “যখন দেখলাম রাজনৈতিক মঞ্চে শিল্পীদের দিয়ে আলো করে রাখা হচ্ছে, তখনই বুঝেছিলাম রাজনীতি ইন্ডাস্ট্রির ভিতরে ঢুকে পড়েছে,” বলেন তিনি। তাঁর দাবি, ধীরে ধীরে পুরো ইন্ডাস্ট্রিটাই রাজনৈতিক প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে। এমনকি ছবি মুক্তি, প্রাইম টাইম পাওয়া কিংবা প্রযোজনার ক্ষেত্রেও নানা অঘোষিত নিয়ম তৈরি হয়েছিল। “ছবি রিলিজ করতে গেলে টাকা দিতে হবে, ছবি করার আগে টাকা জমা রাখতে হবে, এত টাকার বাজেট হলে তবেই প্রাইম টাইম পাওয়া যাবে, এই ধরনের কথা আগে কখনও শুনিনি,” মন্তব্য তাঁর।
অভিনেতা-অভিনেত্রীদের রাজনৈতিক নেতাদের ঘিরে থাকার প্রবণতাকেও কটাক্ষ করেছেন জয়ন্ত দত্ত। তাঁর মতে, তারকা হওয়ার একমাত্র পথ ভালো অভিনয় ও দর্শকের ভালোবাসা। “নেতামন্ত্রীদের পেছনে ঘুরে কেউ স্টার হতে পারে না। দর্শক তোমার কাজ ভালোবাসলে তবেই তুমি স্টার হবে। ভালো ছবি, ভালো গল্প আর ভালো অভিনয়ই একজন শিল্পীকে প্রতিষ্ঠা দেয়,” বলেন তিনি। একইসঙ্গে বর্তমানে বহু শিল্পীর কাজ না পাওয়ার অভিযোগ নিয়েও মন্তব্য করেছেন জয়ন্ত। তাঁর মতে, সব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কারণকে দায়ী করা ঠিক নয়। “আমি নিজেও অনেক সময় কাজ ছাড়া বসে থেকেছি। কিন্তু কখনও মনে হয়নি আমাকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। অনেক সময় চরিত্রের জন্য হয়তো আমাকে ভাবা হয়নি,” বলেন তিনি। শিল্পীদের নিজেদের যোগ্যতা নিয়েও আত্মসমালোচনা করা উচিত বলে মত তাঁর।
সাক্ষাৎকারে উঠে আসে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রসঙ্গও। জয়ন্ত জানান, তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন চৈতালী দত্ত। সেটি ছিল প্রেমের বিয়ে। কিন্তু সেই সংসার মাত্র আট-নয় মাস স্থায়ী হয়েছিল। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। অভিনেতার কথায়, “বিয়ে করে থাকলাম আট মাস কি নয় মাস। তারপর কেস চলল প্রায় পাঁচ বছর। শেষ পর্যন্ত আমি ডিভোর্স পাই।” প্রথম সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে বাইরের কিছু মানুষ এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি হস্তক্ষেপ করেছিলেন। “এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে সেপারেশনটা অনিবার্য হয়ে যায়। কিছু পার্টির লোকজন জড়িয়ে গিয়েছিল। এমনকি বাড়িতে এসে নজরদারিও করত,” দাবি তাঁর। সেই সময় ডিভোর্সের মতো বিষয় সমাজে খুব সহজভাবে দেখা হত না বলেও উল্লেখ করেন অভিনেতা।
আরও পড়ুনঃ মৃ’তদে’হ সেজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্যামেরার সামনে শুয়ে থাকতেন, ছিল না একটাও সংলাপ! আজ যাঁকে চেনেন কোটি মানুষ, সেই জনপ্রিয় অভিনেত্রী এমন কাজের জন্য কত টাকা পেতেন জানেন? অবাক হবেন আপনিও!
তবে জীবনের সেই কঠিন অধ্যায় পেরিয়ে নতুন করে সুখ খুঁজে পেয়েছেন জয়ন্ত দত্ত। যাত্রাপালায় অভিনয়ের সময় অভিনেত্রী সাথী পালের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সেই পরিচয় পরবর্তীতে সম্পর্কে পরিণত হয় এবং পরে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে তাঁদের বিবাহিত জীবন সাত বছরেরও বেশি সময়ের। “আমরা খুব শান্তিতে আছি। সংসার নিয়ে আমি এখন সেটেল,” বলেন জয়ন্ত। রাজনীতি, টলিউডের অন্দরমহল, জনপ্রিয়তার উত্থান-পতন কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙাগড়া সবকিছু নিয়েই নির্ভয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন জয়ন্ত দত্ত। তাঁর এই খোলামেলা মন্তব্য ইতিমধ্যেই বিনোদন ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।






