টেকেনি দুই দাম্পত্যই, স্ত্রী হিসেবে ‘জিরো’ রচনা ব্যানার্জি! বড়পর্দা ছেড়ে ছোটপর্দার হাত ধরেই রাতারাতি হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয় ‘দিদি’! কিন্তু হঠাৎ কী হলো যে তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বাংলার দর্শকরা?

বাংলা বিনোদন জগতের অন্যতম পরিচিত নাম রচনা ব্যানার্জি। একসময় বড়পর্দার জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন, পরে ছোটপর্দায় ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’-এর সঞ্চালক হিসেবে হয়ে উঠেছেন বাংলার ঘরের মেয়ে। ব্যক্তিগত জীবনের নানা উত্থান-পতন, সম্পর্ক ভাঙার যন্ত্রণা, একক মাতৃত্বের দায়িত্ব, ব্যবসায়িক সাফল্য এবং রাজনীতিতে প্রবেশ সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন একাধিক অধ্যায়ের সমষ্টি। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বহু সাফল্য অর্জন করলেও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বারবার চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছেন তিনি। আর সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক ও পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হওয়ায় আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে রচনা ব্যানার্জির দীর্ঘ পথচলা।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলা ছবির জগতে যখন নতুন মুখের খোঁজ চলছিল, তখনই রচনা ব্যানার্জির আবির্ভাব। জন্মসূত্রে তাঁর নাম ছিল ঝুমঝুম বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে পরিচালক সুখেন দাস তাঁর নাম বদলে রাখেন ‘রচনা’। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা তৈরি করে ফেলেন তিনি। বিশেষ করে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর জুটি সেই সময়ের দর্শকদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। একের পর এক বাণিজ্যিক সাফল্য পাওয়া ছবিতে অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি কারও বিকল্প নন, বরং নিজস্ব পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত একজন তারকা। শুধু বাংলা নয়, ওড়িয়া, তেলুগু এবং হিন্দি ভাষার ছবিতেও কাজ করে নিজের জনপ্রিয়তা বিস্তৃত করেছিলেন রচনা।

আরও পড়ুন: “ভেন্টিলেশন থেকে ফিরলেও বাঁচানো গেল না…” হঠাৎ শুরু হয় ভয়াবহ র’ক্তক্ষর’ণ, হিমোগ্লোবিন নেমে গিয়েছিল ৩-এ! তাপস পালের শেষ কয়েক ঘণ্টায় ঠিক কী ঘটেছিল? ছয় বছর পর বাবার মৃ’ত্যু ঘিরে বেদ’নাদায়ক স্মৃতিচারণ কন্যা সোহিনী পালের!

তবে বড়পর্দার সাফল্যের পর জীবনের মোড় ঘুরে যায় ছোটপর্দায়। ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’-এর সঞ্চালক হিসেবে তিনি এমন জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, যা তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে পরিচিত করে তোলে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠানটির মুখ হয়ে রয়েছেন তিনি। মাঝেমধ্যে অন্য জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের দিয়ে অনুষ্ঠানটি পরিচালনার চেষ্টা হলেও দর্শকরা সেই পরিবর্তন মেনে নিতে পারেননি। অনেকের কাছেই ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’ এবং রচনা ব্যানার্জি যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। সাধারণ গৃহবধূ থেকে কর্মজীবী নারী সকলের সঙ্গে সহজভাবে মিশে যাওয়ার ক্ষমতাই তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও কম চড়াই-উতরাই দেখেননি রচনা। ২০০৪ সালে ওড়িয়া অভিনেতা সিদ্ধার্থ মহান্তির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বিনোদন জগতের জনপ্রিয় জুটি হিসেবে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের পথেই হাঁটতে হয় দু’জনকে। পরে ২০০৭ সালে ব্যবসায়ী প্রবাল বসুর সঙ্গে দ্বিতীয়বার সংসার শুরু করেন অভিনেত্রী। তাঁদের পুত্র সন্তান প্রণীলের জন্মও হয়। কিন্তু সেই সম্পর্কও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রায় এক দশক আগে থেকেই তাঁরা আলাদা থাকেন বলে জানা যায়। যদিও সন্তানের স্বার্থে পারিবারিক দায়িত্ব পালনে দু’জনেই সক্রিয় রয়েছেন।

নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন রচনা। একাধিক অনুষ্ঠানে তিনি স্বীকার করেছেন যে স্ত্রী হিসেবে হয়তো তিনি নিজেকে খুব বেশি নম্বর দিতে পারবেন না। তবে একজন মা হিসেবে তাঁর আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি। দীর্ঘদিন ধরে একাই ছেলেকে বড় করে তোলার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি। একই সঙ্গে অভিনয়, সঞ্চালনা এবং ব্যবসাও সফলভাবে পরিচালনা করে চলেছেন। করোনা পরিস্থিতির সময় যখন বিনোদন জগত কার্যত থমকে গিয়েছিল, তখন তিনি নতুনভাবে শাড়ির ব্যবসা শুরু করেন। সেই উদ্যোগ পরবর্তীকালে উল্লেখযোগ্য সাফল্যও পায়। এরপর তাঁর জীবনে আসে আরও একটি বড় পরিবর্তন। বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ থেকে তিনি সরাসরি রাজনীতির ময়দানে প্রবেশ করেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ীও হন। তবে রাজনীতিতে আসার পর তাঁর কিছু মন্তব্য বিতর্কেরও জন্ম দেয়। সমালোচকদের একাংশের মতে, জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও সঞ্চালক হিসেবে যেভাবে তাঁকে দর্শকরা গ্রহণ করেছিলেন, রাজনৈতিক ময়দানে সেই গ্রহণযোগ্যতা সবসময় একইভাবে বজায় থাকেনি। বর্তমানে রচনা ব্যানার্জিকে ঘিরে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা গুঞ্জনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’ থেকেও বাদ পড়লেন তিনি। দর্শকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বাংলা টেলিভিশনের এই পরিচিত মুখকে কি আবার দেখা যাবে, নাকি তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে? সময়ই তার উত্তর দেবে।

You cannot copy content of this page