‘আমার মা যখন মা*রা গেলেন… প্রায় কুড়িটা শাড়ি, একটা কম্বল, আর অগুন্তি বই…’ বরাবর নিজের দায়িত্ব নিজেকে নিতে শিখিয়েছিলেন মা, প্রয়াত স্বাতীলেখা সেনগুপ্তকে স্মরণ করে আবেগে ভাসলেন সোহিনী সেনগুপ্ত! মায়ের ত্যাগের অজানা গল্প ভাগ করতে গিয়ে চোখের জলে ভাসলেন অভিনেত্রী!

বিনোদন জগতের শিল্পীদের জীবন নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ বরাবরই তুঙ্গে। পর্দার উজ্জ্বল সাফল্যের আড়ালে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প, বাবা–মায়ের ত্যাগ, সংগ্রাম এবং ভালোবাসার কাহিনি জানতে চান অনুরাগীরা। অনেক শিল্পীই স্বীকার করেন, তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক তাঁদের পরিবার। বিশেষ করে মায়ের ত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম এবং মূল্যবোধই তাঁদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। সম্প্রতি এমনই এক আবেগঘন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নিজের মাকে নিয়ে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া একাধিক কথা ভাগ করে নিলেন অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত।

প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত ও প্রয়াত অভিনেত্রী স্বাতীলেখা সেনগুপ্তর মেয়ে সোহিনী সেনগুপ্ত ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির পরিবেশে বড় হলেও, কখনও তাঁকে অভিনয়ের পথে আসতে বাধ্য করেননি তাঁর বাবা–মা। সম্প্রতি নিবেদিতা অনলাইনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী জানান, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তিনি পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকেই। মায়ের জীবনযাপন, দায়িত্ববোধ এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠাই তাঁকে আজকের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। মাকে স্মরণ করতে গিয়ে বারবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি।

সোহিনীর কথায়, তাঁর মা ছোটবেলাতেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, তিনি মেয়েকে ভীষণ ভালোবাসেন, কিন্তু শুধুমাত্র সন্তানের জন্য নিজের কাজ ছেড়ে দেবেন না। সংসার, অভিনয়, নাটকের মহড়া সবকিছুর দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতেন তিনি। তাই খুব ছোটবেলা থেকেই সোহিনীকে নিজের কাজ নিজে করতে শেখানো হয়। রান্না থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সব কাজ ধৈর্য ধরে শিখিয়েছিলেন তাঁর মা। ব্যক্তিগত শিক্ষক রাখেননি, অতিরিক্ত আদরেও বড় করেননি। বরং নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়ার শিক্ষা দিয়েছিলেন। সোহিনীর কথায়, মা চাইতেন তিনি এমনভাবে বড় হোন, যাতে কোনও পরিস্থিতিতেই অন্যের উপর নির্ভর করতে না হয়। সেই শিক্ষা আজও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

অভিনেত্রী আরও জানান, তাঁর মা কখনও অর্থ বা বিলাসিতাকে জীবনের আসল সম্পদ বলে মনে করেননি। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি দেখেছিলেন, তাঁর প্রায় কিছুই ছিল না। কয়েকটি শাড়ি, অল্প কিছু গয়না, দুটি বেহালা, দুটি বাদ্যযন্ত্র, একটি বড় পিয়ানো এবং অসংখ্য বই এই ছিল তাঁর মায়ের সারা জীবনের সঞ্চয়। অথচ এই মানুষটিই নিজের সমস্ত সময়, শ্রম এবং ভালোবাসা বিলিয়ে দিয়েছিলেন নাটক, শিল্পচর্চা এবং পরিবারের জন্য। রান্না করতে করতেই কখনও বেহালার অনুশীলন, কখনও নাটকের প্রস্তুতি, আবার কখনও শিল্পীদের নিয়ে বাড়িতে মহড়া সবকিছুই সমান নিষ্ঠায় সামলাতেন তিনি। শিল্পের প্রতি এমন নিবেদন এবং সংসারের প্রতি এমন দায়িত্ববোধই আজও সোহিনীকে অনুপ্রাণিত করে।

আরও পড়ুনঃ “এখন যে কেউ ইউটিউবে চ্যানেল খুলে দেব, প্রসেনজিৎ, সচিনদের কাজ নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে, বিচারসভা বসাচ্ছে!” “যাঁরা নিজের যোগ্যতায় ইতিহাস গড়েছেন, তাঁদেরই আজ আপনাদের থেকে শিখতে হবে?” ক্যামেরার সামনে সমালোচনা করাটা যোগ্যতা নয়, ক্ষো’ভ উগরে দিলেন চিরঞ্জিত চক্রবর্তী! প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বদের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার কি সত্যিই সবার থেকে, আপনাদের কি মত?

মায়ের আর একটি বড় পরিচয় ছিল তাঁর অসীম মমতা। পথ থেকে উদ্ধার করে আনা অসুস্থ কুকুর, পাখি কিংবা অন্য প্রাণীদের নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখতেন তিনি। এমনকি ক্যানসারে আক্রান্ত একটি বেজিকেও বাড়িতে এনে স্নেহে বড় করেছিলেন। সেই পরিবেশেই বড় হয়েছেন সোহিনী। তাঁর কথায়, মায়ের কাছ থেকেই তিনি শিখেছেন ভালোবাসা মানে শুধু মানুষকে নয়, সব জীবকেই আপন করে নেওয়া। আজও যখন তিনি মাকে স্মরণ করেন, তখন কোনও নামী অভিনেত্রী বা শিল্পীর কথা নয়, বরং এমন এক সংগ্রামী মায়ের মুখই ভেসে ওঠে, যিনি নিজের স্বপ্ন, কাজ, সংসার এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে জীবন কাটিয়েছেন। সেই কারণেই আজও মায়ের প্রতিটি শিক্ষা, প্রতিটি ত্যাগ এবং প্রতিটি ভালোবাসার মুহূর্ত তাঁর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে রয়েছে।

You cannot copy content of this page