‘মানুষের কাছে আজও অভিনেত্রী শতাব্দী রায়ের মূল্য রাজনীতিবিদ শতাব্দীর চেয়ে অনেক বেশি!’ রচনার ‘ফেস ভ্যালু’ বিতর্কের আবহেই এবার শতাব্দী রায়ের বি*স্ফোরক মন্তব্য! ‘অভিষেক খুব ইন্টেলিজেন্ট, ভদ্র ও লজিক্যাল ছেলে, কিন্তু আমার সঙ্গে…’ তৃণমূলের সঙ্গে ১৭ বছরের রাজনৈতিক সম্পর্ক কেন ছিন্ন করলে তিনি? মুখ খুলেই উস্কে দিলেন নতুন বিতর্ক?

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী শতাব্দী রায় দীর্ঘদিন ধরেই দর্শকদের কাছে পরিচিত একটি নাম। আশির ও নব্বইয়ের দশকে একের পর এক সফল ছবির মাধ্যমে তিনি বাংলা সিনেমায় নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ‘গুরুদক্ষিণা’, ‘আতঙ্ক’সহ বহু জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। শুধু অভিনেত্রী হিসেবেই নয়, পরিচালক, আবৃত্তিকার এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তিনি নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে অনেকের কাছেই তিনি শুধুমাত্র অভিনেত্রী নন, বরং একজন সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত।

২০০৯ সালে রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যোগ দেওয়ার পর থেকে শতাব্দী রায়ের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি সংসদ সদস্য হন এবং দীর্ঘ সময় ধরে জনসেবার কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর তিনি নতুন রাজনৈতিক অবস্থানে পৌঁছেছেন। এক সাক্ষাৎকারে শতাব্দী জানিয়েছেন, রাজনীতিতে আসার পর তাঁর জীবন অনেকটাই বদলে গেলেও মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা কখনও কমেনি। তবে রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে যেমন অনেক কিছু শিখিয়েছে, তেমনই অনেক প্রশ্নের মুখোমুখিও করেছে। তিনি মনে করেন, রাজনীতি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

সাক্ষাৎকারে তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়ার প্রসঙ্গে শতাব্দী রায় খোলাখুলি নিজের মতামত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত কোনও সমস্যা নেই। বরং অভিষেককে তিনি “ইন্টেলিজেন্ট”, “ডিসেন্ট”, “ভদ্র” এবং “লজিক্যাল” ব্যক্তি বলেই মনে করেন। তবে তাঁর আপত্তি ছিল দল পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে। শতাব্দীর অভিযোগ, তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে সরলতা ও সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের রাজনীতি তৈরি করেছিলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিবেশ বদলে গিয়েছিল। তাঁর মতে, কর্মীদের মতামত শোনার এবং সমস্যার সমাধানের যে সংস্কৃতি থাকা উচিত, তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বহুবার দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে সতর্ক করলেও সেগুলির যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী পরাজয়ের পর দলের ভেতরে আত্মসমালোচনার অভাবও তাঁর দল ছাড়ার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছেন শতাব্দী। তিনি জানান, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর একটি বৈঠকে তিনি আশা করেছিলেন দলের হারের কারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। কিন্তু তাঁর দাবি, সেখানে সেই ধরনের কোনও আত্মসমালোচনার পরিবেশ তিনি দেখতে পাননি। সেই সময় থেকেই তিনি মানসিকভাবে দূরে সরে যেতে শুরু করেন। শতাব্দী আরও বলেন, দলের বহু নেতা-কর্মীর অভিযোগকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরের মানুষের প্রভাব বাড়ার বিষয়টি তাঁকে হতাশ করেছিল। তাঁর মতে, একটি রাজনৈতিক দলে মত প্রকাশের সুযোগ এবং সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন।

সাক্ষাৎকারে শুভেন্দু অধিকারী, মুকুল রায় এবং তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি নিয়েও নিজের মতামত জানান শতাব্দী। তিনি বলেন, শুভেন্দু অধিকারী দল ছেড়ে যাওয়ার ফলে তৃণমূল বড় ধাক্কা খেয়েছিল। তাঁর মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর সংগঠনের স্তরে শুভেন্দুর গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক দক্ষতা ছিল উল্লেখযোগ্য। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, মুকুল রায়ও কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। শতাব্দীর বক্তব্য, দলের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও জনপ্রতিনিধির দল ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয় বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। এত সংখ্যক মানুষের অসন্তোষের পিছনে সংগঠনের ভেতরের সমস্যাগুলিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

আরও পড়ুনঃ “আমার দত্তক নেওয়া মেয়েটাই এখন আমার সবচেয়ে ভালো বান্ধবী” গর্ভে ধারণ করেননি, তবুও তিনিই মা! পেশায় ইঞ্জিনিয়ার স্বামীর সঙ্গে অল্প বয়সেই বিয়ে, কেন নিজের সন্তান নেওয়ার প্রয়োজন কোনদিনও অনুভব করেননি অনন্যা সেনগুপ্ত? মাতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে জীবনের কোন অজানা অধ্যায় সামনে আনলেন, ‘কুসুম’ খ্যাত অভিনেত্রী?

রাজনীতির পাশাপাশি নিজের অভিনয় জীবন নিয়েও কথা বলেছেন শতাব্দী রায়। তিনি জানান, আজও বহু জায়গায় মানুষ তাঁকে প্রথমে অভিনেত্রী হিসেবেই মনে রাখেন। তাঁর মতে, অভিনয় তাঁকে যে ভালোবাসা দিয়েছে, তা রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রেরণা জুগিয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবনের অগ্রাধিকার বদলেছে। বর্তমানে দীর্ঘ সময় ধরে যাত্রা বা ধারাবাহিক অভিনয়ের মতো শারীরিক পরিশ্রমসাপেক্ষ কাজ করা তাঁর পক্ষে আর আগের মতো সহজ নয়। তবুও তিনি মনে করেন, একজন শিল্পী হিসেবে মানুষের যে ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, তা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। একইসঙ্গে তিনি ঈশ্বরের প্রতি নিজের গভীর বিশ্বাসের কথাও উল্লেখ করেন। শতাব্দীর কথায়, জীবনে যা কিছু পেয়েছেন তার পিছনে কঠোর পরিশ্রম যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে ভাগ্য এবং মানুষের আশীর্বাদ। তাই রাজনীতি হোক বা অভিনয় দুই ক্ষেত্রেই তিনি নিজের অভিজ্ঞতাকে জীবনের বড় শিক্ষা হিসেবে দেখেন।

You cannot copy content of this page