বাংলা টেলিভিশনের পরিচিত মুখ ঋদ্ধিশ চৌধুরী (Ridhish Chowdhury) আজ ‘কমলা নিবাস’-এর নায়ক আদিত্য হিসেবে দর্শকদের প্রশংসা পাচ্ছেন। তবে এই জায়গায় পৌঁছনোর পথ তাঁর জন্য মোটেই সহজ ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে ধীরে ধীরে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন তিনি। ‘অলৌকিক না লৌকিক’-এর বিক্রম থেকে ‘হরগৌরী পাইস হোটেল’-এর হানি, বিভিন্ন চরিত্রে দেখা গিয়েছে তাঁকে। ‘তারে ধরি ধরি মনে করি’-তেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন এই অভিনেতা। কিন্তু নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর তাঁকে নিয়ে শুরুতে কম প্রশ্ন ওঠেনি। এখন সেই ঋদ্ধিশকেই ‘কমলা নিবাস’-এ দেখে দর্শকদের একাংশের ধারণা বদলেছে। তবে তাঁর আজকের সাফল্যের পিছনে যে দীর্ঘ সংগ্রাম রয়েছে, সম্প্রতি এক পডকাস্টে সেই অজানা অধ্যায়ের কথাই তুলে ধরেছেন অভিনেতা।
শৈশবের দিনগুলির কথা বলতে গিয়ে ঋদ্ধিশ জানিয়েছেন, চরম দারিদ্র্যের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর কথায়, “ছোটবেলায় ডেঞ্জারাস পভার্টি দেখেছি আমি।”
সেই অভিজ্ঞতাই নাকি তাঁর মনে আরও ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তাগিদ তৈরি করেছিল। ঋদ্ধিশের কথায়, “ওই পভার্টি থেকে হয়তো আমার মনে একটা খিদে এসেছিল যে টু বি ভেরি রিচ।” কতটা কঠিন ছিল সেই সময়, তার একটি ঘটনা এখনও তাঁর মনে স্পষ্ট। তিনি জানান, “দু’দিন মতন আমাদের মানে খাবার জোটেনি।” সেই পরিস্থিতিতে তাঁর মা উনুনের ছাই দিয়ে বাড়ির ওয়াশরুমের সবুজ মগ পরিষ্কার করে পরের বাড়ি থেকে ভাত চেয়ে এনে তাঁকে খাইয়েছিলেন। শৈশবের সেই অভাবই পরবর্তী জীবনে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জেদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে জানিয়েছেন অভিনেতা।
অভিনয়ের জগতে আসার আগে নাচের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন ঋদ্ধিশ। ব্যাকআপ ডান্সার হিসেবে কাজ করার সময় তাঁকে অত্যন্ত কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। তিনি জানিয়েছেন, দিনের পর দিন প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে চলত তাঁদের মহড়া। তাঁর কথায়, “সকাল ৯টা থেকে আমাদের রিহার্সাল শুরু হতো রাত্রি ৯টা ১০টা শেষ হতো।” এমন দীর্ঘ সময়ের অনুশীলনের মধ্যেও খাবারের ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সীমিত। ঋদ্ধিশ জানিয়েছেন, “ব্রেকফাস্টে বিস্কুট, বিস্কুট চা, বিস্কুট জল এরকমভাবে ননস্টপ গেছে দু বছর।” এই অভিজ্ঞতাকে তিনি নিজেই “অদ্ভুত ট্রেনিং” বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায়, “ওটা একটা ইনহিউম্যান একটা ট্রেনিং ছিল।” এই কঠিন সময়ই তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে আরও শক্ত করে তুলেছিল।
তবে শুধু পরিশ্রম নয়, নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে ঋদ্ধিশের জেদও ছিল প্রবল। অডিশনে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর জীবনে কম ছিল না। কখনও তাঁকে দেখে সরাসরি ‘থ্যাংক ইউ’ বলে দেওয়া হয়েছে, তবুও সেখান থেকে ফিরে আসেননি তিনি। অভিনেতা জানিয়েছেন, একটি অডিশনে তাঁকে শুরুতেই বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও তিনি স্ক্রিপ্ট নিয়ে সারা দিন অপেক্ষা করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সবার শেষে অডিশন দেওয়া, যাতে নিজের সেরাটা তুলে ধরতে পারেন। ঋদ্ধিশের কথায়, “জেদ তো ছিল।” এই জেদের সঙ্গে নিজের পরিশ্রমকে মিলিয়েই বারবার সুযোগ পাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, অডিশনে প্রতিভার পাশাপাশি ভাগ্যেরও ভূমিকা থাকে, কিন্তু নিজের দিক থেকে চেষ্টায় কোনও ঘাটতি রাখা উচিত নয়।
আজ ‘কমলা নিবাস’-এ নায়ক হিসেবে ঋদ্ধিশকে দেখে যে দর্শকরা প্রশংসা করছেন, তাঁদের কাছে তাঁর এই অতীত হয়তো অনেকটাই অজানা। একসময় তাঁর চেহারা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল এবং কেউ কেউ তাঁকে নায়কসুলভ নয় বলে কটাক্ষ করেছিলেন। এমনকী তাঁকে সরকারি কর্মীর মতো দেখতে বলেও মন্তব্য করেছিলেন অনেকে। কিন্তু ধারাবাহিক এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে আদিত্য চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে। সংলাপ বলার ধরন, আবেগ প্রকাশ এবং সংযত অভিনয়ের জন্য প্রশংসা পাচ্ছেন তিনি। এই সপ্তাহে ‘কমলা নিবাস’ স্লটলিড করায় তাঁর চরিত্র নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একসময় যাঁকে নিয়ে সংশয় ছিল, সেই অভিনেতাই এখন ধারাবাহিকের অন্যতম শক্তি হয়ে উঠেছেন। তবে ঋদ্ধিশের কাছে এই সাফল্যের মূল্য সম্ভবত আরও বেশি, কারণ এর পিছনে রয়েছে শৈশবের অভাব, কঠিন প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘদিনের অপেক্ষা।
আরও পড়ুনঃ “আমি আগাগোড়াই ‘ওয়ান ওম্যান ম্যান’, আজ অবধি কোনও সম্পর্কে যাইনি যেখানে…এক হাতে কখনও তালি বাজে না!” মাত্র পাঁচ মাসের সংসার, শ্যামৌপ্তির সঙ্গে বিচ্ছেদের গুঞ্জনের মাঝেই ভাইরাল রণজয় বিষ্ণুর মন্তব্য! অভিনেতার কথাতেই ফের সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু জোর বিত*র্ক! প্রেম ও চরিত্র নিয়ে কী এমন বললেন তিনি? দীর্ঘ সম্পর্কের তালিকা মনে করিয়ে কটা’ক্ষ নেটপাড়ার!
নিজের জীবনের এই লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে ঋদ্ধিশ ভাগ্যকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে ভাগ্যের অপেক্ষায় বসে থাকার মানুষ তিনি কখনও ছিলেন না। পরিবারের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার ইচ্ছাই তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে বলে তাঁর বক্তব্য। অভিনেতা বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকে জানতাম একটা ভাঙা ঘড়িও দিনে দুবার সঠিক সময় দেখায়।” এরপরই তাঁর উপলব্ধি, “আমি ফিল করে ফেলেছিলাম যে দিস ইজ দ্য টাইম।” আজকের জায়গায় পৌঁছে তাঁর জীবন যেন সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন। দুদিন খাবার না পাওয়া শিশু থেকে ব্যাকআপ ডান্সার, সেখান থেকে একাধিক পার্শ্বচরিত্র এবং অবশেষে নায়ক হয়ে ওঠার এই যাত্রায় রয়েছে বহু বছরের পরিশ্রম। তাই ঋদ্ধিশ চৌধুরীর বর্তমান সাফল্য শুধু একটি ধারাবাহিকের নায়ক হওয়ার গল্প নয়, বরং অভাবকে পেরিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করার এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ফল।






