“আমার বাবার মতো বাবা পেলে আপনাদের তিন পুরুষেরও জীবন ভরে যেত শিক্ষায়, তাঁকে নিয়েও নোং*রা কথা বলতে ছাড়েননি ওরা!” মেয়েকে ধর্ম বা পরিচয় দিয়ে নয়, মানুষ হিসেবেই দেখতে শিখিয়েছিলেন! নিজের শক্ত মেরুদণ্ডের প্রমাণ দিয়ে, মোদীর পোস্টার বিতর্কে প্রয়াত বাবাকে টেনে কটাক্ষের কড়া জবাব দিলেন শ্রীলেখা মিত্র!

নিজের স্পষ্ট বক্তব্য এবং প্রতিবাদী অবস্থানের জন্য প্রায়ই আলোচনায় থাকেন অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিকৃত পোস্টার হাতে প্রজন্মের প্রতিবাদ মিছিলে হাঁটাকে কেন্দ্র করে বিতর্কে জড়িয়েছেন তিনি। এই ঘটনার পর সমাজমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে নানা মন্তব্য করেন নেটপাড়ার একাংশ। এমনকি কটাক্ষ করতে গিয়ে শ্রীলেখার প্রয়াত বাবাকেও টেনে আনা হয় বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী। নিজের জন্মদিনের ঠিক আগে সেই সমস্ত কটূক্তির জবাব দিতে সমাজ মাধ্যমে একটি দীর্ঘ খোলা চিঠি লেখেন তিনি। সেখানে নিজের বাবার কথা স্মরণ করার পাশাপাশি জীবনের নানা কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল বাবাকে হারানোর কষ্ট, তেমনই ছিল নিজের অবস্থানে অটল থাকার দৃঢ়তা।

শ্রীলেখা জানান, তাঁর বাবা ছিলেন একজন সম্পূর্ণ স্বনির্ভর মানুষ। জমিদার পরিবারে জন্ম হলেও রাজনৈতিকভাবে তিনি ছিলেন সিপিআইএমের সদস্য। ধর্মের বিভাজন, দাঙ্গা এবং দেশভাগের মতো কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনেও প্রভাব ফেলেছিল। তবু তিনি মেয়েকে মানুষকে ধর্ম বা পরিচয় দিয়ে নয়, একজন মানুষ হিসেবেই দেখতে শিখিয়েছিলেন। শ্রীলেখার মতে, ঠিককে ঠিক এবং ভুলকে ভুল বলার সাহস তিনি বাবার কাছ থেকেই পেয়েছেন। তাঁর দাবি, বাবার মতো একজন মানুষকে বাবা হিসেবে পাওয়া তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। কটাক্ষকারীদের উদ্দেশে অভিনেত্রী বলেন, “আমার বাবার মতো বাবা যদি আপনারা পেতেন, তাহলে হয়তো আপনাদের তিন পুরুষেরও জীবন ভরে যেত তাঁর শিক্ষা, তাঁর আদর্শ আর তাঁর মেরুদণ্ডের গল্প বলতে।”

নিজের প্রতিবাদী অবস্থান নিয়েও সমাজ মাধ্যমের পোস্টে স্পষ্ট কথা বলেছেন শ্রীলেখা। তাঁর বক্তব্য, নিজের মত প্রকাশ করার জন্য তাঁকে কোনও বাইরের শক্তি বা অর্থ সাহায্য করে না। তিনি স্পষ্ট করে লিখেছেন, “কোনো ফরেইন ফান্ড আমাকে কথা বলার জন্য স্পন্সর করে না, কেউ আমাকে ভাড়া করে সাহস দেয় না।” এরপর নিজের অভিনয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথাও তুলে ধরেন অভিনেত্রী। ২০২১ সালের ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন কলকাতা’ ছবির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সময়কার কিছু ছবি ও স্মৃতি তিনি ভাগ করে নেন। সেই সময় বিদেশে যাওয়া আটকানোর জন্য নানা চেষ্টা হয়েছিল বলেও জানান তিনি। তবে নিজের উপার্জনের টাকা খরচ করেই বিদেশে গিয়েছিলেন এবং তৎকালীন কোভিড বিধি মেনে ইতালিতে যাওয়ার আগে সুইজারল্যান্ডে নিভৃতবাসেও ছিলেন।

সুইজারল্যান্ডে নিজের জন্মদিন কাটানোর সেই সময়ের কথাও আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেছেন শ্রীলেখা। শাড়ি পরে সেখানে ঘুরে বেড়ানোর বেশ কিছু ছবি এবং ভিডিয়ো তিনি জমিয়ে রেখেছিলেন। ইচ্ছে ছিল দেশে ফিরে সেই স্মৃতিগুলি বাবাকে দেখাবেন। কিন্তু দেশে ফেরার পরই তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত চিরদিনের জন্য চলে যান। বাবার সেই দুশ্চিন্তার কথাও এখনও মনে রেখেছেন অভিনেত্রী। মেয়েকে নিয়ে বাবার মনে চিন্তা ছিল, “আমি চলে গেলে আমার আদরের টুম্পার কী হবে?”
আজ সেই বাবাকেই যেন আশ্বস্ত করে শ্রীলেখা জানিয়েছেন, তাঁর শেখানো শক্তি নিয়েই তিনি এখনও নিজের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে শুধু বাবাকে নিয়ে কটাক্ষ নয়, কঠিন সময়ে কাছের মানুষদের পাশে না থাকার বিষয়টিও শ্রীলেখার লেখায় উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, ভয় এবং হুমকির পরিস্থিতিতে অনেকেই একসময় তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। যাঁদের জন্য তিনি কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরে সুখের সময়ে সরে গিয়েছেন বলেও আক্ষেপ করেছেন অভিনেত্রী। তবু সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজের অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। শ্রীলেখার কথায়, একা হয়ে গেলেও তিনি মেরুদণ্ড সোজা রেখেই নিজের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বাবাকে স্মরণ করে তিনি লিখেছেন, “বাবা, তোমার টুম্পাকে টলানো এত সহজ নয়। কারণ তুমি আমাকে শুধু জীবন দাওনি, মেরুদণ্ড দিয়েছ।” এই কথার মধ্যেই বাবার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং নিজের লড়াইয়ের শক্তির কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন অভিনেত্রী।

আরও পড়ুনঃ ‘মিথ্যা ঢাকতে আবরণের প্রয়োজন, একসুতোয় গাঁথা সত্যকে নয়!’ ‘সত্য যেন ন’গ্ন শরীর, লুকানোর কিছু নেই…’ শ্যামৌপ্তি মুদলির সঙ্গে দাম্পত্যে ফাটলের জল্পনার মাঝেই বি*স্ফোরক রণজয় বিষ্ণু! এবার স্ত্রীকে ঘিরে কোন সত্যিটা সামনে আনলেন অভিনেতা? তবে কি অবশেষে বিচ্ছেদের গুঞ্জনে দিলেন সিলমোহর?

সবশেষে কটাক্ষকারীদের উদ্দেশেও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন শ্রীলেখা। তাঁর মতে, তাঁকে বা তাঁর প্রয়াত বাবাকে নিয়ে কেউ কী বলল, তাতে তাঁদের পরিচয় বা মূল্য প্রমাণ হয় না। বরং এই ধরনের মন্তব্য যাঁরা করেন, তাঁদের নিজেদের মানসিকতা এবং দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকাশ্যে আসে। নিজের জন্মদিনের প্রাক্কালে বাবার স্মৃতিকে সামনে রেখে লেখা এই দীর্ঘ বার্তায় তাই আবেগের পাশাপাশি ছিল প্রতিবাদের সুরও। সমাজ মাধ্যমে পোস্টটি প্রকাশ্যে আসার পর তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নেটিজেনদের একটি বড় অংশ অভিনেত্রীর স্পষ্টবাদিতা এবং নিজের অবস্থানে অটল থাকার সাহসের প্রশংসা করেছেন। প্রয়াত বাবার স্মৃতিকে শক্তি করে শ্রীলেখার এই জবাব তাই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

You cannot copy content of this page