পারিবারিক কুটকা’চালি বা পরস্পরের বিরুদ্ধে ষ’ড়যন্ত্র নয়, নায়ক-নায়িকার গল্প ছেড়েও পরিবারের প্রতিটি সদস্যের হাসি-কান্না, অভিমান, ভালোবাসাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জমজমাট এক ধারাবাহিক! ২০১১-তে শেষ হলেও ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র সেই উষ্ণতা আজও দর্শকের মনে অমলিন! বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া এমন পরিবারকেন্দ্রিক ধারাবাহিক কি আর ফিরবে বাংলা টেলিভিশনে? মিস করেন আপনারা?

বাংলা বিনোদন জগতে এমন কিছু গল্প তৈরি হয়, যা পর্দায় সম্প্রচার শেষ হওয়ার বহু বছর পরেও দর্শকের মনে থেকে যায়। সময় বদলায়, বদলে যায় ধারাবাহিকের গল্প বলার ধরন, চরিত্রের উপস্থাপনাও। কিন্তু কিছু ধারাবাহিক যেন সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে ওঠে চিরকালীন। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ তেমনই এক নাম। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও বাংলা ধারাবাহিকের দর্শকদের একটা বড় অংশের স্মৃতিতে এই ধারাবাহিকের চরিত্র, পারিবারিক সম্পর্ক এবং গল্পের আবেগ এখনও তাজা। শুধু একটি নায়ক-নায়িকার প্রেমের গল্প নয়, বরং একটি পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া সম্পর্কের টানাপোড়েনই এই ধারাবাহিককে অন্যদের থেকে আলাদা জায়গা দিয়েছিল।

স্টার জলসায় ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট শুরু হয়েছিল ‘ওগো বধূ সুন্দরী’। ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা এই ধারাবাহিকের মোট পর্ব ছিল ৪১০টি। ধারাবাহিকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ললিতা এক ধনী পরিবারের ডানপিটে, চঞ্চল, জেদি এবং কিছুটা বদমেজাজি মেয়ে। ছোটবেলাতেই মাকে হারানো ললিতা অনেকটা একাকিত্বের মধ্যেই বড় হয়ে ওঠে। এরপর তার বিয়ে হয় মধ্যবিত্ত যৌথ পরিবারের ছেলে ঈশানের সঙ্গে। সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে এসে নতুন পরিবারে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার গল্প, শাশুড়ির সঙ্গে মিষ্টি লড়াই, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সঙ্গে ধীরে ধীরে সম্পর্ক তৈরি সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক আবেগঘন পারিবারিক আখ্যান। ‘My Fair Lady’ এবং মহানায়ক উত্তম কুমারের ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ থেকে অনুপ্রাণিত এই ধারাবাহিকটি সেই সময় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

‘ওগো বধূ সুন্দরী’-কে আজকের ধারাবাহিকের সঙ্গে তুলনা করলে সবচেয়ে বড় পার্থক্য চোখে পড়ে গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে। বর্তমান সময়ের বহু মেগায় গল্প মূলত নায়ক-নায়িকার সম্পর্ক, তাঁদের ব্যক্তিগত সমস্যা কিংবা প্রেম-বিয়ে-বিচ্ছেদকে ঘিরেই এগিয়ে চলে। ফলে পরিবারের অন্য সদস্যরা অনেক সময় গল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। অথচ ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-তে ললিতা ও ঈশান নিঃসন্দেহে গল্পের প্রাণ হলেও তাঁদের পাশাপাশি পরিবারের প্রত্যেকটি চরিত্রের নিজস্ব গুরুত্ব ছিল। শাশুড়ি-বউমার সম্পর্ক থেকে শুরু করে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পারস্পরিক বোঝাপড়া সবকিছুকেই গল্পের অংশ করা হয়েছিল। ফলে দর্শক শুধু নায়ক-নায়িকার জন্য নয়, গোটা পরিবারটির সঙ্গে আবেগে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

আর এখানেই যেন আজকের ধারাবাহিকের সঙ্গে তৈরি হয় সবচেয়ে বড় ফারাক। বর্তমানে গল্পে চমক তৈরি করতে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি, ষড়যন্ত্র, পরকীয়া, সম্পত্তি নিয়ে টানাপোড়েন কিংবা একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। অবশ্যই সব ধারাবাহিক একরকম নয়, তবে দর্শকদের একটা অংশের অভিযোগ, গল্পে পারিবারিক বন্ধনের জায়গা অনেকটাই পিছিয়ে গিয়েছে। সেখানে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ মনে করিয়ে দেয়, সংঘাত ছাড়াও একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে দর্শককে দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা সম্ভব। ললিতার নতুন পরিবারে মানিয়ে নেওয়া কিংবা সম্পর্কগুলোকে আপন করে নেওয়ার মধ্যে ছিল আবেগ, হাসি, অভিমান এবং ভালোবাসা যা দর্শকের কাছে অনেক বেশি পরিচিত এবং বাস্তব মনে হয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ রুদ্রনীলের কাঁধে আরও বড় দায়িত্ব দিলেন শুভেন্দু অধিকারী! রাজ্য সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমিটির চেয়ারম্যান এবার শিবপুরের বিজেপি বিধায়ক! বাংলার হাল ফেরাবেন?

তাই ২০১১ সালে শেষ হয়ে গেলেও ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ আজও শুধুমাত্র একটি পুরনো ধারাবাহিকের নাম নয়, বরং বাংলা টেলিভিশনের এক বিশেষ সময়ের স্মৃতি। সেই সময়ের ধারাবাহিকগুলোতে পরিবার মানে শুধু গল্পের পটভূমি ছিল না, পরিবারই ছিল গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র। দায়িত্ব, সম্পর্কের প্রতি সম্মান, একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং ভালোবাসার মতো বিষয়গুলোও গল্পের মধ্যেই জায়গা করে নিত। ২০২৬-এর ব্যস্ত সময়ে দাঁড়িয়ে তাই পুরনো দর্শকদের অনেকেই যেন ফিরে তাকান সেই দিনগুলোর দিকে। কারণ ললিতা-ঈশানের গল্প শেষ হয়ে গেলেও তাঁদের পরিবারকে ঘিরে তৈরি হওয়া সেই উষ্ণতা আজও দর্শকের মনে প্রশ্ন তোলে এমন পারিবারিক বন্ধনকে কেন্দ্র করে বাংলা টেলিভিশনে আবার কি কোনও ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ তৈরি হবে?

You cannot copy content of this page