টলিউডের পরিচিত এবং শক্তিশালী অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম রজতাভ দত্ত (Rajatava Dutta)। খলনায়ক থেকে কৌতুক চরিত্র, নানা ধরনের ভূমিকায় নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন তিনি। বড় পর্দায় তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় বরাবরই দর্শকদের নজর কেড়েছে। তবে আজকের এই পরিচিতির পিছনে রয়েছে একেবারেই অন্যরকম একটি পথচলা। অভিনয়কে একসময় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করতেন না তিনি। বরং জীবনের শুরুর দিকে নানা ধরনের কাজ করে দিন কাটিয়েছেন অভিনেতা। সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথাই সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে।
ছোটবেলা থেকেই বেশ ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন রজতাভ দত্ত। বাবা অল্প বয়সে মারা যাওয়ার পর তাঁর মা নিজের শোক সামলাতেই ব্যস্ত ছিলেন। ফলে ছোটবেলায় রজতাভের উপর সেভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখার সুযোগ হয়নি পরিবারের। স্কুল জীবনেও তাঁর দুষ্টুমি এবং গণ্ডগোলের জন্য যথেষ্ট পরিচিতি ছিল। কোনও সমস্যা হলে শিক্ষকদের প্রথমেই তাঁর নাম মনে পড়ত। এই কারণে শিক্ষকদের কাছ থেকে মারও খেতে হয়েছে তাঁকে। স্কুলের সেই দুরন্ত স্বভাবই ধীরে ধীরে তাঁকে অন্যরকম জীবনের দিকে নিয়ে যায়।
স্কুল শেষ করার পরও অভিনয় নিয়ে কোনও বিশেষ পরিকল্পনা ছিল না রজতাভের। সেই সময় তাঁর কয়েকজন স্কুলবন্ধু তাঁকে থিয়েটারে যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। প্রথমদিকে বন্ধুর কথায় থিয়েটারে গেলেও অভিনয় করার বদলে অন্য কাজই করতেন। কখনও শিল্পীদের খাওয়া ও জল পৌঁছে দিতেন, আবার বসে বসে তাঁদের অভিনয় দেখতেন। অভিনয়ের প্রতি তখনও তাঁর নিজের কোনও আগ্রহ তৈরি হয়নি। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, সেই সময় তাঁর উচ্চারণও খুব একটা স্পষ্ট ছিল না। তাই থিয়েটারের জগৎকে শুরুতে অনেকটাই উপেক্ষা করেছিলেন তিনি।
এরপর জীবিকার তাগিদে চাকরির দিকেও পা বাড়ান রজতাভ দত্ত। জীবনের একটা সময় হিসাবরক্ষকের কাজ করেছিলেন তিনি। কিন্তু চাকরি করতে করতেই ধীরে ধীরে থিয়েটারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে অভিনয়ের জগতেই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এর পাশাপাশি একটি পরিচিত পত্রিকায় থিয়েটারের সমালোচনাও লিখতেন তিনি। তবে শুধু অভিনয় বা লেখালেখির উপর নির্ভর করে তখন সংসার চালানো সহজ ছিল না। তাই প্রয়োজনে নানা ধরনের কাজও করতে হয়েছে তাঁকে।
সরকারি পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের পাহারা দেওয়ার কাজও করেছিলেন রজতাভ। সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, নিজের চাকরি না হলেও অন্যদের চাকরি পাওয়ার পরীক্ষায় সাহায্য করতেন। এই কাজ থেকে কখনও দু’শো, কখনও চারশো টাকা পর্যন্ত পেতেন তিনি। মজার বিষয়, পরীক্ষার হলে সবাই তাঁকে ‘স্যার’ বলে ডাকতেন বলেও জানিয়েছেন অভিনেতা। এক বন্ধুর বাবার মাধ্যমেই এই কাজের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, ৫০ কিংবা ১০০ টাকার বিনিময়ে অন্যের ব্যবসায়িক চুক্তির জন্য বিজ্ঞাপনের কাজও করেছেন। জীবনের সেই কঠিন সময়গুলোই পরবর্তীতে তাঁর অভিনয়ের পথ তৈরি করে দেয়।
আরও পড়ুনঃ “আমার বাবার মতো বাবা পেলে আপনাদের তিন পুরুষেরও জীবন ভরে যেত শিক্ষায়, তাঁকে নিয়েও নোং*রা কথা বলতে ছাড়েননি ওরা!” মেয়েকে ধর্ম বা পরিচয় দিয়ে নয়, মানুষ হিসেবেই দেখতে শিখিয়েছিলেন! নিজের শক্ত মেরুদণ্ডের প্রমাণ দিয়ে, মোদীর পোস্টার বিতর্কে প্রয়াত বাবাকে টেনে কটাক্ষের কড়া জবাব দিলেন শ্রীলেখা মিত্র!
এরপর ছোট যাত্রা থেকে মূলধারার থিয়েটার এবং ধীরে ধীরে বড় পর্দায় প্রবেশ করেন রজতাভ দত্ত। অভিনয়ের বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে কাজ করে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেন তিনি। খলনায়কের চরিত্রে যেমন দর্শকদের মনে ছাপ ফেলেছেন, তেমনই কৌতুক চরিত্রেও পেয়েছেন প্রশংসা। তবে নিজের এই দীর্ঘ যাত্রায় স্কুলের সেই বন্ধুদের কথা আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রাখেন অভিনেতা। যাঁরা তাঁকে থিয়েটারে আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, তাঁরা এখন আর সেই জগতের সঙ্গে যুক্ত নন। কিন্তু তাঁদের সেই একসময়ের অনুরোধই রজতাভের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। যে অভিনয়কে একদিন উপেক্ষা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়ে উঠেছে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।






