বাঙালির আড্ডায় উত্তম কুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ঘিরে তুলনা আজও চলে। ফুটবলে যেমন ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান, খাবারে যেমন চিংড়ি ও ইলিশ, তেমনই সিনেমায় এই দুই মহাতারকাকে নিয়েও মতের লড়াই কম নয়। তবে পর্দার প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বহুবার উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে ভালোবাসার সুরে ব্যাখ্যা করেছেন। এমনকি একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “উত্তমদার সঙ্গে তো আমার প্রেমের সম্পর্ক!” অন্যদিকে উত্তম কুমারও সৌমিত্রকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতোই স্নেহ করতেন। তাঁর আদরের নাম ছিল ‘পুলু’, আর সেই পুলুকে ঘিরেই একবার এমন ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও তাঁদের সম্পর্কের উষ্ণতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
ঘটনাটি দক্ষিণ কলকাতার ম্যান্ডিভিলা গার্ডেনসের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের। উত্তম কুমারের ছেলে গৌতমের বিয়ে উপলক্ষে সেখানে বসেছিল জমজমাট আয়োজন। টলিউডের একাধিক নামী তারকার উপস্থিতিতে গোটা অনুষ্ঠান যেন তারার মেলায় পরিণত হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন উত্তম কুমারের অত্যন্ত কাছের মানুষ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও। বিয়েবাড়িতে পৌঁছে অন্যান্য অতিথিদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করছিলেন তিনি। এরপর রাতের খাবারের দিকে এগিয়ে যেতেই আচমকা দূর থেকে উত্তম কুমারের গলা শুনতে পান সৌমিত্র। মহানায়ক সোজা তাঁকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলেন, “পুলু! ওদিকে যাস না একদম!”
হঠাৎ এমন ডাক শুনে স্বাভাবিকভাবেই চমকে গিয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ততক্ষণে উত্তম কুমার নিজেই তাঁর কাছে এগিয়ে এসেছেন। গম্ভীর মুখে মহানায়ক জানিয়ে দেন, “তুই আজ খাবি না! এখানকার খাবার তোকে আমি কিছুতেই খেতে দেব না।” বিয়েবাড়িতে দাঁড়িয়ে এমন কথা শুনে কিছুটা হতভম্ব হয়ে যান সৌমিত্র। কী কারণে তাঁকে খাবার খেতে দেওয়া হচ্ছে না, তা প্রথমে বুঝতেই পারেননি তিনি। তাই কোনও কথা না বলে খাবারের জায়গা থেকে পিছিয়ে আসেন। সৌমিত্রর মুখের সেই বিভ্রান্তি দেখে শেষ পর্যন্ত আসল কারণটি জানান উত্তম কুমার।
মহানায়ক জানতেন, সৌমিত্রর গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ছিল এবং বেশি তেল-মশলাদার খাবার তাঁর শরীরের পক্ষে ভালো নয়। তাই ভালোবেসেই তাঁকে বিয়েবাড়ির খাবার থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন উত্তম। তিনি সৌমিত্রকে বলেন, “তোর তো গ্যাস্ট্রিকের মারাত্মক সমস্যা! এই বিয়েবাড়ির তেল-মশলাদার খাবার খেলে শরীর খারাপ হতে বাধ্য। তাই এসব তোকে ছুঁতেও দেব না।” শুধু মুখে নিষেধ করেই থেমে থাকেননি তিনি। সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী গৌরীদেবীকে ডেকে পুলুর জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা করতে বলেন। তাঁর নির্দেশ ছিল, “পুলুর জন্য আলাদা করে দই আর মিষ্টি নিয়ে এসো তো! ও আজ এসব হালকা খাবারই খাবে।”
নিজের ছেলের বিয়ের মতো ব্যস্ত একটি অনুষ্ঠানেও উত্তম কুমার সৌমিত্রর শারীরিক সমস্যার কথা ভুলে যাননি। বরং এত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও তাঁর খাবারদাবারের দিকে আলাদা করে নজর রেখেছিলেন। মহানায়কের এই আচরণ সৌমিত্রকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল। পর্দায় দুজনকে দর্শক যতই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখুক, বাস্তবে তাঁদের সম্পর্ক যে কতটা গভীর ছিল, এই ঘটনাই তার প্রমাণ। উত্তম কুমারের কাছে সৌমিত্র শুধু সহকর্মী ছিলেন না, ছিলেন স্নেহের ছোট ভাইয়ের মতো। আর সৌমিত্রর কাছেও উত্তম ছিলেন একাধারে প্রিয় সহশিল্পী, অভিভাবক এবং আপনজন। তাই সেই দিনের এই ছোট্ট ঘটনাও তাঁদের সম্পর্কের এক অমলিন স্মৃতি হয়ে থেকে যায়।
আরও পড়ুনঃ ‘রাজা আর নেই’ শেষরক্ষা হল না, স্বামীকে চিরতরে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন পাপিয়া সেন! বার্ধক্য নয়, দীর্ঘদিনের শারীরিক জটিলতায় শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে পরিচালক রাজা সেন! হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ! কীভাবে কেটেছিল তাঁর শেষ কয়েকটা দিন? মৃ’ত্যুর আগে কী বলেছিলেন, জানালেন অভিনেত্রী?
উত্তম কুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পর্ক নিয়ে বাঙালির মনে আজও আলাদা আবেগ রয়েছে। রুপোলি পর্দায় তাঁদের নিয়ে তুলনা যতই চলুক, ব্যক্তিগত জীবনে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জায়গাটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। মহানায়কের স্নেহে ‘পুলু’ নামটি যেমন আরও আপন হয়ে উঠেছিল, তেমনই সৌমিত্রও উত্তম কুমারের সেই যত্ন কখনও ভুলতে পারেননি। ছেলের বিয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও একজন প্রিয় মানুষের শরীরের কথা মনে রাখা সেই আন্তরিকতারই পরিচয়। তাঁদের বন্ধুত্বের এই অজানা মুহূর্ত আজও দুই কিংবদন্তির সম্পর্কের অন্য একটি দিক সামনে আনে। তাই উত্তম ও সৌমিত্রকে শুধু পর্দার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখলে তাঁদের সম্পর্কের আসল সৌন্দর্যটি ধরা পড়ে না। বাস্তব জীবনে তাঁদের বন্ধন ছিল স্নেহ, শ্রদ্ধা এবং নিখাদ ভালোবাসায় গড়া এক অমলিন সম্পর্ক।






