কলকাতার শোভন চক্রবর্তীকে নিশ্চয়ই মনে আছে? নিরাপত্তারক্ষীর কাজের ফাঁকে তাঁর দরাজ কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার একটি ভিডিও সমাজ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর রাতারাতি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ভাইরাল হওয়াই তাঁর জীবনে এক কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে আসে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি হারাতে হয় তাঁকে। অথচ গান তাঁর কাছে কোনও সাময়িক শখ ছিল না, বরং দীর্ঘদিনের সাধনা এবং জীবনের আসল পরিচয়। শোভন ছিলেন প্রশিক্ষিত শাস্ত্রীয় ও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। অর্থের প্রয়োজনে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করলেও তাঁর আসল স্বপ্ন ছিল গান শেখানো এবং একজন সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবেই নিজের জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। চাকরি হারানোর পর সেই স্বপ্ন যেন আবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিল। তবে এবার সেই থমকে যাওয়া জীবনেই নতুন মোড় এসেছে।
শোভনের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুর ভারতী সঙ্গীত কলা কেন্দ্র। তবে তাঁকে শুধুমাত্র আর্থিক সাহায্য কিংবা অন্য কোনও সাধারণ চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাঁর শিল্পীসত্তা এবং দীর্ঘদিনের সঙ্গীতচর্চাকেই গুরুত্ব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সুর ভারতীর সভাপতি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং পডকাস্টার অরিজিৎ চক্রবর্তীর উদ্যোগে শোভনকে প্রতিষ্ঠানের Official Cultural Examiner হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ এবার তিনি নিজের সঙ্গীতজ্ঞান কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের দায়িত্বও পালন করবেন। প্রতিষ্ঠানের তরফে জানানো হয়েছে, এই দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে শোভনের শিল্পী হিসেবে স্বাধীনতাকেই সম্মান জানানো হয়েছে। অরিজিৎ চক্রবর্তীর কথায়, একজন সত্যিকারের শিল্পীকে জীবিকা নির্বাহের জন্য নিজের আত্মসম্মানের সঙ্গে আপস করতে হওয়া উচিত নয়। শোভন বাংলার সঙ্গীত ঐতিহ্যের প্রতি গভীরভাবে নিবেদিত একজন শিল্পী বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
শুধু পরীক্ষকের দায়িত্ব দিয়েই থেমে থাকেনি সুর ভারতী। শোভনের নিজের যে সঙ্গীত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে, সেটিকেও নতুন করে চালু করার জন্য সম্পূর্ণ অ্যাকাডেমিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যে কাজটি শোভন এতদিন ধরে করতে চেয়েছিলেন, সেই সঙ্গীত শেখানোর পথেই এবার নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হল। আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে যে মানুষটিকে একসময় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ বেছে নিতে হয়েছিল, তিনি এবার নিজের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা দিয়েই নিজের পরিচয় তৈরি করার সুযোগ পাচ্ছেন। ১৭ আগস্ট সুর ভারতীর বার্ষিক সাউথ ২৪ পরগনা জেলা শিল্প প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁকে ১০ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়া হয়। পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনাও জানানো হয় তাঁকে। এই সম্মান তাঁর কাছে শুধুমাত্র আর্থিক সহায়তা নয়, শিল্পী হিসেবে তাঁর এতদিনের লড়াই এবং সাধনার স্বীকৃতিও হয়ে উঠেছে।
শোভন নিজেও এই নতুন সুযোগকে অত্যন্ত অর্থবহ বলে মনে করছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি কখনও সাময়িক প্রচার চাননি। তাঁর একমাত্র ইচ্ছা ছিল নিজের গানকে সঙ্গে নিয়ে এবং সম্মান বজায় রেখে জীবন কাটানো। অরিজিৎ চক্রবর্তী এবং সুর ভারতী তাঁর সেই শিল্পীসত্তার কথাটাই বুঝতে পেরেছেন বলে মনে করেন শোভন। পরীক্ষকের দায়িত্ব পাওয়া এবং নিজের সঙ্গীত স্কুলকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা তাঁর সঙ্গীতজীবনকে নতুন দিশা দিয়েছে। যে মানুষটির গান একসময় সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে তাঁকে চাকরি হারানোর পরিস্থিতিতে ফেলেছিল, সেই গানই এবার তাঁর জীবনের নতুন পথ খুলে দিল। পরিচিতির জন্য ভাইরাল হওয়ার চেয়ে নিজের শিল্পকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার যে ইচ্ছা শোভনের ছিল, সেই ইচ্ছাই এবার বাস্তব রূপ পেল।
শোভনের এই নতুন অধ্যায় তাই শুধুমাত্র একজন ভাইরাল শিল্পীকে সাহায্য করার গল্প নয়। বরং এটি এমন একজন মানুষের নিজের আসল পরিচয়ে ফিরে আসার গল্প, যাঁকে পরিস্থিতির চাপে নিজের স্বপ্নের বাইরে গিয়ে কাজ করতে হয়েছিল। নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি তাঁর জীবিকার প্রয়োজন মিটিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তাকে পূর্ণতা দেয়নি। এবার সুর ভারতীর সহযোগিতায় সেই জায়গাতেই ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেলেন তিনি। পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি নিজের সঙ্গীত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগও তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, তাঁর মিউজিক অ্যাকাডেমিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তারা পাশে থাকবে। ফলে যে স্বপ্ন একসময় আর্থিক সমস্যার চাপে থেমে গিয়েছিল, সেটিই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল।
আরও পড়ুনঃ রিল-ফলোয়ারের যুগে জিতের দর্শন একেবারেই আলাদা! সোশ্যাল মিডিয়ায় অনীহার নেপথ্যে কী কারণ? স্ত্রী ভাগ করে নেন সুন্দর মুহূর্ত, অথচ নিজে কেন চুপ? কোন বিষয় তাঁকে ভাবায়, স্পষ্ট করলেন জিৎ?
শোভনের গল্পে তাই ভাইরাল হওয়ার থেকেও বড় হয়ে উঠেছে তাঁর নিজের শিল্পী পরিচয়। গান গাওয়ার জন্য একসময় যে ভিডিও তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত করেছিল, তার পরিণতি চাকরি হারানো হলেও শেষ পর্যন্ত সেই গানই তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে এল তাঁর কাঙ্ক্ষিত জীবনের দিকে। সুর ভারতীর এই উদ্যোগে তিনি শুধু সম্মানী বা সংবর্ধনা পেলেন না, পেলেন নিজের প্রতিভাকে পেশা হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি স্থায়ী সুযোগ। একজন সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথও এবার তাঁর সামনে খুলে গেল। অরিজিৎ চক্রবর্তীর কথাতেও সেই শিল্পীসত্তাকে মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টিই স্পষ্ট। শোভনের নিজের কথায়, এই দায়িত্ব তাঁর সঙ্গীতযাত্রাকে একটি অর্থপূর্ণ দিশা দিয়েছে।






‘ইস্! তোমার বর কি তোমাকে খেতে দেয় না?’ ছয় বছর পর্দার বাইরে থাকার পর ফের অভিনয়ে ফিরতেই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী অনামিকা সাহাকে কেন দেবশ্রী রায় মুখ থেকে এমন অপমানজনক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল? নেপথ্যে কোন ছবি, জানলে চমকাবেন!