বাংলা নাট্য ও চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম কিংবদন্তি নাম উৎপল দত্ত। অভিনেতা, নাট্যকার, পরিচালক একাধিক পরিচয়কে ছাপিয়ে তিনি ছিলেন প্রতিবাদী নাট্যচর্চার এক শক্তিশালী মুখ। ১৯২৯ সালের ২৯ মার্চ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বরিশালে জন্ম তাঁর। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনা করার পর খুব অল্প বয়সেই থিয়েটারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৯৩ সালের ১৯ আগস্ট মাত্র ৬৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে ফিরে দেখা যায় এমন এক শিল্পীর জীবন, যেখানে অভিনয় আর রাজনৈতিক আদর্শ একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।
বাংলা বিনোদন জগতের কাছে উৎপল দত্ত শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক যুগের প্রতীক। মঞ্চনাটককে মানুষের কথা বলার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন তিনি। মার্কসবাদী আদর্শে বিশ্বাসী উৎপল দত্ত তাঁর নাটকের মধ্য দিয়ে শোষণ, অন্যায় এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে বারবার সরব হয়েছেন। ‘কল্লোল’, ‘টিনের তলোয়ার’-সহ তাঁর একাধিক নাটক বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। মঞ্চের পাশাপাশি বাংলা ও হিন্দি সিনেমাতেও তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। তাঁর অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল চরিত্রকে শুধু অভিনয় না করে তার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ঢুকে পড়া। ফলে গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক নাটক থেকে শুরু করে সিনেমার জনপ্রিয় চরিত্র সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের আলাদা ছাপ রেখে গিয়েছেন।
উৎপল দত্তের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নানা ওঠাপড়ায় ভরা। তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলেন অভিনেত্রী শোভা সেন। প্রগতিশীল নাট্যকর্মী হিসেবে শোভা সেনও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন। ১৯৬০ বা ১৯৬১ সালের দিকে উৎপল দত্ত ও শোভা সেন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। উৎপল দত্তের থেকে শোভা সেন ছিলেন কয়েক বছরের বড়। তাঁদের সম্পর্ক ছিল শুধু স্বামী-স্ত্রীর নয়, একই সঙ্গে দুই সহযোদ্ধার। নাট্যদল সামলানো থেকে আর্থিক সংকট, রাজনৈতিক চাপ—প্রতিটি কঠিন সময়ে শোভা সেন তাঁর পাশে থেকেছেন। উৎপল দত্তের স্বভাব ছিল স্পষ্ট কথা বলা এবং আপসহীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করা। সেই কারণে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শোভা সেন তাঁর সংসার ও নাট্যজীবন সামলে পাশে থেকেছেন।

তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের মূল্যও কম দিতে হয়নি উৎপল দত্তকে। সরকারের নীতির প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মহালয়ার দিন তাঁকে ভারত রক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ সময় তাঁকে কারাগারে থাকতে হয়। জেলের সেই দিনগুলোও তাঁর আদর্শকে বদলে দিতে পারেনি। বরং প্রতিকূলতা পেরিয়ে আরও শক্তভাবে নাটকের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন তিনি। পুলিশি চাপ, আর্থিক সংকট কিংবা নাট্যদলের উপর হামলা কোনও কিছুই তাঁর নাট্যচর্চাকে থামাতে পারেনি। নাটকের জন্য নিজের আর্থিক সম্পদ পর্যন্ত ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর কাছে থিয়েটার ছিল শুধু বিনোদন নয়, মানুষের কাছে সত্য এবং প্রতিবাদের কথা পৌঁছে দেওয়ার অস্ত্র।

আরও পড়ুনঃ দরাজ কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে হারাতে হয়েছিল নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি! থমকে গিয়েছিল জীবন, এবার নিজের স্বপ্নের পেশাতেই ফিরলেন শোভন চক্রবর্তী! আর্থিক সাহায্য নয়, সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে বাঁচার ইচ্ছাই পূরণ করল সুর ভারতী ও পডকাস্টার অরিজিৎ চক্রবর্তী! প্রশিক্ষিত শাস্ত্রীয় ও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী পাশে দাঁড়িয়ে এমন উদ্যোগের প্রশংসায় পঞ্চমুখ নেটপাড়া!
১৯৯৩ সালের ১৯ আগস্ট উৎপল দত্তের জীবনাবসান হলেও তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু হয়নি। বাংলা থিয়েটার এবং চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করে। মঞ্চকে মানুষের কথা বলার জায়গা করে তোলা, নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসে অটল থাকা এবং শিল্পের জন্য সমস্ত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়ার যে সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, সেটিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তাঁর পাশে শোভা সেনের দীর্ঘ সংগ্রামী উপস্থিতিও এই অধ্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই মৃত্যুর ৩৩ বছর পরও উৎপল দত্ত শুধু স্মৃতিতে নন, বাংলা নাট্যচর্চার ইতিহাসে তিনি আজও এক জীবন্ত কিংবদন্তি।






‘ইস্! তোমার বর কি তোমাকে খেতে দেয় না?’ ছয় বছর পর্দার বাইরে থাকার পর ফের অভিনয়ে ফিরতেই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী অনামিকা সাহাকে কেন দেবশ্রী রায় মুখ থেকে এমন অপমানজনক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল? নেপথ্যে কোন ছবি, জানলে চমকাবেন!