বিনোদন জগতে এমন অনেক তারকা থাকেন, যাঁদের জনপ্রিয়তা শুধু নির্দিষ্ট কোনও সময়ের মধ্যে আটকে থাকে না। পর্দায় তাঁদের উপস্থিতি, অভিনয়ের ধরন কিংবা কোনও একটি চরিত্র বছরের পর বছর দর্শকের মনে থেকে যায়। সময়ের সঙ্গে তাঁরা চলে গেলেও তাঁদের অভিনয় নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে বারবার ফিরে আসে। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও এমনই এক আলাদা জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন অভিনেতা নিমু ভৌমিক।
বাংলা ছবির অন্যতম পরিচিত চরিত্রাভিনেতা নিমু ভৌমিক ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় করেছেন। নায়ক হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেই তিনি দর্শকের মনে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। কখনও হাসিয়েছেন, কখনও বিরক্ত করেছেন, আবার কখনও খলচরিত্রে দর্শকের মনে ভয় বা ঘৃণার জন্ম দিয়েছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি জীবনের শেষ পর্বে সক্রিয় রাজনীতিতেও যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৩৫ সালের ১৪ নভেম্বর অবিভক্ত বাংলার দিনাজপুরে জন্ম নিমু ভৌমিকের। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল।
পরবর্তীতে কলকাতায় এসে নাটকের সঙ্গে যুক্ত হন। মঞ্চে কাজ করতে করতেই ধীরে ধীরে অভিনয়ের জগতে নিজের পরিচয় তৈরি করেন। ১৯৫৮ সালে ‘বাঘাযতীন’ ছবির মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্র জীবনের শুরু। এরপর একের পর এক বাংলা ছবিতে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন অত্যন্ত পরিচিত মুখ। ‘বাঘিনী’, ‘গণদেবতা’, ‘দাদার কীর্তি’, ‘সাহেব’, ‘গুরুদক্ষিণা’-সহ বহু জনপ্রিয় ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছে। তাঁর বিশেষত্ব ছিল চরিত্রকে নিজের মতো করে ফুটিয়ে তোলা। কমেডি থেকে খলনায়ক প্রতিটি ভূমিকাতেই তাঁর নিজস্ব অভিনয়শৈলী আলাদা করে চোখে পড়ত। এমনকী অনেক সময় ছবির নাম মনে না থাকলেও তাঁর অভিনীত চরিত্র বা মুখ দর্শকের মনে থেকে গিয়েছে।
তবে অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর জীবনের আরেকটি অধ্যায়ও ছিল যথেষ্ট আলোচিত। একটা সময় তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং প্রয়াত সিপিএম নেতা সুভাষ চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। পরে রাজনৈতিক অবস্থান বদলে বিজেপিতে যোগ দেন। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রায়গঞ্জ কেন্দ্র থেকে বিজেপির প্রার্থীও হন। প্রচারে তাঁর অভিনেতা পরিচয় নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ থাকলেও সেই জনপ্রিয়তা ভোটে পরিণত হয়নি। নির্বাচনে পরাজিত হন তিনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সমস্যাও বাড়তে থাকে। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে গড়িয়ার বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয় তাঁকে। পরিবারের কাছেই কাটছিল জীবনের শেষ দিনগুলি।
আরও পড়ুনঃ “গতকাল পর্যন্ত ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে, আজ আর ফোনে সাড়া নেই…” নেপালের প্রাকৃতিক দুর্যো’গে আটকে সস্ত্রীক খরাজ মুখোপাধ্যায়! চিন সীমান্তের কাছে হড়পা বান, চারদিকে বিপর্যস্ত পরিস্থিতি! অভিনেতার খবর না মেলায় উদ্বে’গ বাড়ছে পরিবারে, বাবাকে নিয়ে কী জানালেন পুত্র বিহু?
অবশেষে ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট গড়িয়ার নিজের বাড়িতে ৮৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নিমু ভৌমিক। তাঁর মৃত্যুর পরও অবশ্য শেষ হয়ে যায়নি তাঁর অভিনয়ের পথচলা। জীবনের শেষদিকের ছবি ‘১০ মাস ১০ দিনের গল্প’ মুক্তি পেয়েছিল তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে। ফলে পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মৃত্যুর পরও দর্শকের সামনে ফিরে এসেছে। নায়ক না হয়েও যে একজন অভিনেতা দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারেন, নিমু ভৌমিক তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর সংলাপ, অভিব্যক্তি এবং চরিত্রাভিনয়ের নিজস্ব ধরন বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে।






