মীর আফসার আলি আজ বাংলার অত্যন্ত পরিচিত সঞ্চালক ও অভিনেতা। তাঁর স্ত্রী সোমা ভট্টাচার্য পেশায় সফল চিকিৎসক। তবে তাঁদের সম্পর্কের শুরুর সময়টা মোটেই এতটা সহজ ছিল না। ভিন্ন ধর্মের দুজন মানুষের প্রেম এবং বিয়ে মেনে নিতে পারেনি তৎকালীন সমাজের একাংশ। ফলে ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে নতুন সংসার শুরু করার পাশাপাশি মীরকে লড়তে হয়েছিল নিজের পরিচয় তৈরি করার জন্যও। একদিকে ছিল ব্যক্তিগত জীবনে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন, অন্যদিকে কেরিয়ারে নিজের জায়গা তৈরি করার চ্যালেঞ্জ। আজ যে মীরের ব্যারিটন কণ্ঠে মুগ্ধ শ্রোতা দর্শক, সেই সময় তাঁর ভিতরে চলছিল এক কঠিন লড়াই। সম্প্রতি সায়নের জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘অকপট’-এ এসে সেই সময়ের অজানা গল্পই শোনালেন মীর।
১৯৯৯ সালের সেই সময়টায় মীরের কেরিয়ারও ছিল ওঠাপড়ার মধ্যে। টেলিভিশনে ‘খাস খবর’-এর মতো সংবাদ বুলেটিন পড়তেন তিনি, পাশাপাশি সকাল সকাল কণ্ঠ শোনা যেত আকাশবাণীতেও। এর মধ্যেই তৈরি হয়েছিল ‘মির্চ মশলা’ নামে একটি অন্য ধরনের অনুষ্ঠান। হিন্দি টেলিভিশনের শেখর সুমনের জনপ্রিয় টকশো ‘মুভস অ্যান্ড শেখর’-এর আদলে ভাবা হয়েছিল অনুষ্ঠানটি। রেইনবো প্রডাকশনের ব্যানারে তৈরি সেই শোতে একাধিক তারকার সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা হয়েছিল। মীর জানান, মোট ২৪টি পর্বের শুটিংও সম্পূর্ণ হয়েছিল। ‘মিরাক্কেল’ বা ‘মির্চি’র মতো জনপ্রিয় অনুষ্ঠান আসার অনেক আগেই এই ভাবনাটির জন্ম হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ২৪টি এপিসোড আর দর্শকের সামনে আসেনি।
কেন সেই অনুষ্ঠান আটকে গেল, তার পিছনেও ছিল মীরের কেরিয়ার নিয়ে এক অদ্ভুত আশঙ্কা। তখন তিনি ‘খাস খবর’-এর মতো কড়া সংবাদ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হিসেবে দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছিলেন। মীরের কথায়, সেই সময় মনে করা হয়েছিল, তিনি যদি একই সঙ্গে চটপটে কমেডি টকশো করেন, তাহলে দর্শক তাঁকে আর সংবাদ পাঠক হিসেবে মেনে নেবেন না। এই যুক্তির কারণেই কার্যত ক্যানবন্দি হয়ে থেকে যায় ‘মির্চ মশলা’র ২৪টি পর্ব। তবে সেই সময় কাজের ক্ষেত্রে কোনও খামতি রাখেননি মীর। সকাল শুরু হত রেডিও দিয়ে, বিকেলে চলত টেলিভিশনের খবরের শুটিং। তারপর রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টে বা ৫টা পর্যন্ত চলত টকশোর শুটিং, সেখান থেকে আবার সরাসরি ছুটতে হত রেডিও স্টেশনে।
কেরিয়ারের এই কঠিন সময়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও তখন বড় পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন মীর। ভালোবাসার মানুষ সোমা ভট্টাচার্য তখন মেডিক্যালের ছাত্রী। সেই সোমাকেই বিয়ে করেছিলেন মীর, কিন্তু তাঁদের ভিন্নধর্মী সম্পর্ক এবং বিয়েকে তৎকালীন সমাজ খুব সহজভাবে নেয়নি। নতুন সংসার শুরু করার ক্ষেত্রে দুজনের পাশে পারিবারিক সমর্থনও সেভাবে ছিল না। ফলে নিজেদের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা এবং সমাজের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তোলা, দুটো লড়াইই একসঙ্গে চালাতে হয়েছিল তাঁদের। মীরের কথায়, সেই সময়টা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেশি ‘মেহনতের’ সময়। একদিকে সংসারকে দাঁড় করানোর চেষ্টা, অন্যদিকে কেরিয়ারে শক্ত জমি তৈরি করার লড়াই, সব মিলিয়ে সময়টা তাঁর কাছে ছিল অত্যন্ত কঠিন।
মীর জানিয়েছেন, সেই পরিস্থিতিতে তাঁদের নিজেদের জায়গা তৈরি করতেই হত। তাঁর মতে, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সোমাকে একজন সফল চিকিৎসক হয়ে উঠতে হয়েছিল। একইভাবে তাঁকেও একজন সফল এন্টারটেইনার হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করতে হয়েছিল। দুজনেই নিজেদের পেশায় যতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, ততই যেন তাঁদের প্রতি সমাজের গ্রহণযোগ্যতাও বেড়েছে। অন্তত মীরের মনে হয়েছে, সাফল্যই তাঁদের সেই জায়গাটা ফিরিয়ে দিয়েছে, যেটা একসময় সমাজের চোখে হারিয়ে গিয়েছিল। তাই সেই সময়ের কষ্টকে তিনি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখেন না। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য সেই লড়াই তাঁকে আরও বেশি পরিশ্রম করতে শিখিয়েছিল বলেই মনে করেন মীর।
জীবনের সেই অভিজ্ঞতার পর নিজের বিশ্বাস এবং কাজের জায়গা নিয়েও মীরের অবস্থান একেবারে পরিষ্কার। তিনি বলেছেন, “আমি মন্দিরেও যাই না, মসজিদেও যাই না।” তাঁর কাছে রেডিও স্টুডিও এবং কাজের জায়গাই মন্দির-মসজিদের মতো। মীরের কথায়, “কর্মই আমার ধর্ম, কর্মই আমার বর্ম।” তিনি নিজের কাজকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যেতে চান, যা অরাজনৈতিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ হয়। যেখানে কোনও ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে আলাদা করে দেখা হবে না। বরং তাঁর কাজ যেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, সেটাই তাঁর লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন মীর।
আরও পড়ুনঃ “নিজের ব্যক্তিগত জীবন বিকিয়ে দিচ্ছে যখন…” “একান্ত ব্যক্তিগতটা ক্যামেরার সামনে তুলে ধরার জন্য তো নিতেই হবে…এই জন্যই তো বিগ বসে যায়!” টাকা না পেলে নিজের প্রাইভেসি কেন বিক্রি করবে? অনিন্দ্য সেনগুপ্তের মন্তব্যে শ্রীলেখা মিত্রর সাফ সমর্থন! অভিনেতার পাশে দাঁড়িয়ে কী সওয়াল স্পষ্টবাদী অভিনেত্রীর?
আজ ‘গপ্পো মীরের ঠেক’-এর সঞ্চালক হিসেবে কিংবা অভিনেতা হিসেবে যে পরিচিতি মীর তৈরি করেছেন, তার পিছনে রয়েছে সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের সময়। রেডিও জকি থেকে ‘খাস খবর’-এর সঞ্চালক, সেখান থেকে বিনোদনের নানা ক্ষেত্রে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। একই সময়ে সোমাও নিজের পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন একজন সফল চিকিৎসক হিসেবে। তাঁদের সম্পর্কের শুরুর দিনগুলিতে যে সামাজিক চাপ এবং অনিশ্চয়তা ছিল, সময়ের সঙ্গে তা অনেকটাই বদলে যায়। মীরের বিশ্বাস, নিজেদের কাজ এবং সাফল্যের মাধ্যমেই তাঁরা সেই গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছেন। তাই অতীতের কোনও অভিজ্ঞতা নিয়েই তাঁর মনে আফসোস নেই। জীবনের সেই লড়াইকে পিছনে ফেলে আজও নিজের কাজকেই সবচেয়ে বড় পরিচয় হিসেবে দেখতে চান বাঙালির প্রিয় সঞ্চালক ও অভিনেতা মীর আফসার আলি।






‘অন্যায় দেখলে রুখে দাঁড়ায়, দরকারে গলা তোলে!’ ‘সকলে গিরগিটির মতো রং বদলে ফেলল…তোমরা কি ওঁকে ভয় পাচ্ছো?’ সামাজিক মাধ্যমে লাগাতার সমালোচনা ও কটাক্ষের মাঝেই, স্বামী ভরতের ‘বিগ বস’-এর ক্যাপ্টেন্সির প্রশংসা করেই কাদের বিঁধলেন গর্বিত স্ত্রী জয়শ্রী?