গাড়িতে উঠেই হঠাৎ চমকে উঠেছিলেন উত্তম কুমার! সাধের সেই জিনিসটা আচমকাই গায়েব, মহানায়কের চোখেমুখে আ’তঙ্ক! ভিতরে লুকিয়ে ছিল কী এমন যা দেখে অস্থির অবস্থায় হয় তাঁর?

একদিকে একের পর এক সফল ছবির শুটিং, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে চলছিল নানা অশান্তি। সত্তরের দশকের শেষ দিকে এমনই এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার। স্ত্রী গৌরীদেবীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে যথেষ্ট অস্থির করে তুলেছিল। তবে সেই প্রভাব কখনও শুটিং ফ্লোরে আসতে দিতেন না অভিনেতা। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই নিজের ব্যক্তিগত সমস্যাকে দূরে সরিয়ে চরিত্রের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ডুবে যেতেন তিনি। ফলে ইন্ডাস্ট্রির অধিকাংশ মানুষ তাঁর মনের ভিতরের সেই অশান্তির আঁচও পেতেন না। তাঁর খুব কাছের কয়েকজন মানুষ এবং সুপ্রিয়া দেবীই সেই সময়ের ব্যক্তিগত কষ্ট সম্পর্কে জানতেন।

গৌরীদেবীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার পর ভবানীপুরের পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে সুপ্রিয়া দেবীর ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে থাকতে শুরু করেছিলেন উত্তমকুমার। বিভিন্ন স্মৃতিকথা এবং জীবনী থেকে জানা যায়, জীবনের শেষ দিকে সেখান থেকেই নিয়মিত শুটিংয়ে যাতায়াত করতেন তিনি। ততদিনে গৌরীদেবীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও অনেকটাই কমে গিয়েছিল। এই ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের মধ্যেই একদিন ঘটে যায় এমন একটি ঘটনা, যা মহানায়ক শেষ জীবন পর্যন্ত ভুলতে পারেননি বলে জানা যায়। সময়টা ছিল সত্তরের দশকের একেবারে শেষ দিক। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সুপ্রিয়া দেবীর বাড়ি থেকে শুটিংয়ে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠেছিলেন উত্তমকুমার। কিন্তু গাড়িতে উঠেই এমন একটি জিনিসের খোঁজ পেলেন না, যা তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

গাড়িতে বসে অভ্যাসমতো সামনের ড্যাশবোর্ডের দিকে হাত বাড়াতেই চমকে ওঠেন উত্তমকুমার। তাঁর প্রিয় ছোট্ট টেপ রেকর্ডারটি সেখানে ছিল না। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়েন এবং গাড়ির ভিতরেই সেটি খুঁজতে শুরু করেন। ড্রাইভারকেও সঙ্গে নিয়ে তন্নতন্ন করে খোঁজা হয় টেপ রেকর্ডারটি। সেই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রযোজক অসীম সরকার। অসীমবাবু মহানায়কের চোখেমুখে এমন দুশ্চিন্তা আগে দেখেননি বলেই জানা যায়। পরে জানা যায়, যন্ত্রটি হারিয়ে যায়নি, সেটি চুরি হয়েছিল এবং সেই খবর উত্তমকুমারকে আরও ভেঙে দিয়েছিল।

তবে প্রশ্ন হল, একটি ছোট্ট টেপ রেকর্ডার নিয়ে এতটা চিন্তিত হওয়ার কারণ কী ছিল? আসলে সেই যন্ত্রটি উত্তমকুমারের কাছে শুধুই একটি সাধারণ রেকর্ডিং মেশিন ছিল না। তাঁর জীবনী এবং ঘনিষ্ঠজনদের সূত্রে জানা যায়, একটি বিশেষ ব্যক্তিগত অভ্যাস ছিল মহানায়কের। দিনভর কী করলেন, কার সঙ্গে কী কথা হল, সিনেমার কাজ নিয়ে কী ভাবলেন, এমনকী ব্যক্তিগত জীবনের নানা অনুভূতিও তিনি নিজের গলায় রেকর্ড করে রাখতেন। অর্থাৎ লিখিত ডায়েরির বদলে অনেকটা নিজের কণ্ঠে তৈরি করা ডায়েরির মতো ছিল সেই ক্যাসেটগুলি। জীবনের নানা ঘটনা এবং মনের কথা তিনি সেখানে ধরে রাখতেন। এই কারণেই টেপ রেকর্ডারটি তাঁর কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং সেটি চুরি যাওয়ার ঘটনায় তিনি এতটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন।

আরও পড়ুনঃ ‘সজল ঘোষ অত্যন্ত অ’সভ্য’, যাদবপুরের অধ্যাপককে নিয়ে মন্তব্যে বিজেপি বিধায়ককে পাল্টা শ্রীলেখা

ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তমকুমার তাঁর এই ব্যক্তিগত অডিও ডায়েরিকে কখনও সহজে নিজের কাছ থেকে দূরে রাখতেন না। তাই সেই টেপ রেকর্ডার হঠাৎ চুরি হয়ে যাওয়াকে তিনি শুধু একটি জিনিস হারানোর ঘটনা হিসেবে দেখেননি। এর মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বহু অপ্রকাশিত কথা এবং স্মৃতি অন্যের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল। সেই সময় তাঁর চোখেমুখে যে অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল, তা প্রযোজক অসীম সরকারকেও অবাক করেছিল। পরে ঘনিষ্ঠদের সূত্রে এই ঘটনার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। তাঁর কাছে হারিয়ে যাওয়া ক্যাসেটগুলির মধ্যে ছিল নিজের জীবনের নানা দিনের কথা এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির রেকর্ড। তাই বলা হয়, সেই দিন শুধু একটি টেপ রেকর্ডারই চুরি যায়নি, উত্তমকুমারের জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত কিছু অধ্যায়ও যেন তাঁর হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল।

You cannot copy content of this page