বাংলা বিনোদন জগতে এমন কিছু শিল্পী রয়েছেন, যাঁদের পরিচয় কোনও একটি চরিত্র বা সময়ের মধ্যে আটকে থাকে না। মিতা চট্টোপাধ্যায় তাঁদেরই একজন। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ে পা রেখে বাংলা সিনেমা, মঞ্চ, যাত্রা ও ধারাবাহিকে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি। ‘জন্মভূমি’র পিসিমা চরিত্র তাঁকে ঘরে ঘরে পরিচিত করলেও তাঁর শিল্পীজীবনের পরিধি ছিল আরও অনেক বড়। অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্য, সঙ্গীত, সেতার এবং লেখালেখিতেও তাঁর দক্ষতা রয়েছে। ৯৪ বছর বয়সেও লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া মিতা চট্টোপাধ্যায় আজও নিজের সৃষ্টিশীলতাকে থামতে দেননি। পর্দায় নিয়মিত দেখা না গেলেও শিল্পী হিসেবে তাঁর দীর্ঘ অবদান এবং একাধিক প্রজন্মের দর্শকের মনে তৈরি করা জায়গা তাঁকে এখনও আলাদা করে চেনায়।
মিতা চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবনের শুরু হয়েছিল খুব ছোট বয়সে, প্রায় চল্লিশের দশক থেকে। পরিবারের তরফে অভিনয়ে কোনও বাধা ছিল না বলেই জানিয়েছেন তিনি। ‘রামপ্রসাদ’ ছবিতে ছদ্মবেশী কালী চরিত্রে অভিনয় করে ছোট বয়সেই নজর কাড়েন। পরে প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা ও পরিচালনায় ‘হানাবাড়ি’ ছবিতেও অভিনয় করেন। শুধু অভিনয়েই থেমে থাকেননি তিনি। কত্থক, কথাকলি, মণিপুরী ও ভরতনাট্যমের মতো একাধিক নৃত্যশৈলী শিখেছেন। বিভিন্ন সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্যও পেয়েছেন। ওয়েস্ট বেঙ্গল মিউজিক কম্পিটিশনে ক্লাসিকালে তিনবার প্রথম হওয়ার পাশাপাশি কীর্তনেও প্রথম হয়ে রূপোর বীণা পেয়েছিলেন। নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ির কাছে অভিনয় শেখার সুযোগও পেয়েছেন তিনি। অহীন্দ্র চৌধুরী, ছবি বিশ্বাস, কমল মিত্র ও নরেশ মিত্রের মতো বিশিষ্ট শিল্পীদের সঙ্গে মঞ্চে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
তবে তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে রয়েছে ‘জন্মভূমি’র পিসিমা চরিত্র। মূলত মাত্র ছ’দিনের কাজের জন্য ধারাবাহিকে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু রাজবাড়ির জাদরেল পিসিমার একটি বিশেষ দৃশ্য তাঁর চরিত্রের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়। রাজবাড়িতে প্রজাদের হামলার পরিস্থিতিতে পিসিমা এগিয়ে গিয়ে তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। সেই দৃশ্য দেখার পর পরিচালক ইন্দর সেন হাততালি দেন। এরপর আর ছ’দিনে কাজ শেষ হয়নি। পিসিমা চরিত্রটি দর্শকদের এতটাই পছন্দ হয় যে মিতা চট্টোপাধ্যায়ের ছ’দিনের কাজ শেষ পর্যন্ত গড়ায় সাড়ে সাত বছরের দীর্ঘ সফরে। এই চরিত্রই তাঁকে বাংলা টেলিভিশনের দর্শকের কাছে আরও আপন করে দেয়। তাঁর আসল নাম ছিল নমিতা চট্টোপাধ্যায়। ‘নীল শাড়ি’ ছবির সময় একই নামে একাধিক অভিনেত্রী থাকায় অনুপ কুমারের মজার মন্তব্য থেকেই ‘নমিতা’র ‘ন’ বাদ দিয়ে নাম হয়ে যায় ‘মিতা’। সেই নামেই পরবর্তীকালে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জুড়ে রয়েছে কিংবদন্তি উত্তমকুমারের পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। ছোটবেলা থেকেই গিরীশ মুখার্জি রোডের সেই বাড়িতে তাঁর যাতায়াত ছিল। উত্তমকুমার, বরুণকুমার ও তরুণকুমারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল ছোটবেলা থেকেই। সেই সময়ের স্মৃতি বলতে গিয়ে মহানায়ককে ‘সোনার নায়ক’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, একবার নাচের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর একটি দৈনিক পত্রিকায় তাঁর ছবি দেখে উত্তমকুমার অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন এবং তাঁর প্রতিভার প্রশংসা করেছিলেন। মিতা চট্টোপাধ্যায়ের কাছেই জানা যায়, বেতার নাটকে তাঁর গুরু ছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, মঞ্চে শিশির কুমার ভাদুড়ি এবং সিনেমায় দেবকী কুমার বসু। সেতার শিখেছেন আলি আকবর খাঁয়ের কাছে। এমনকি রেডিয়ো নাটকে সেতারবাদকের চরিত্রে অভিনয় করার সময় নিজেই সেতার বাজিয়ে সংলাপ বলেছিলেন। তাঁর কথায়, জীবনে শেখা কোনও কিছুই কখনও বিফলে যায় না।
আরও পড়ুনঃ “জিতু তুসি কামাল হো!” “একজন পুরুষ মানুষও যে এতটা হিংসুটে হতে পারে, বিগ বস বাংলায় জিতু না এলে বুঝতাম না!” “বুঝে গেছে রাজবীরকে হারাতে হলে ম্যানুপুলেট করতে হবে, কত ভালো খেলছিল ছেলেটা এখন হাতের পুতুল!” কোন মোক্ষম চালে লাক্সারি বাজেট হারাল গোটা বাড়ি? ছাপ্পা ভোট থেকে বার্নার চুরি, দুর্নিবারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ দর্শক জিতুকে ‘কপি ক্যাট’ তকমা দিয়ে কেন করছেন তুলোধোনা?
আজ পর্দা থেকে অনেকটাই দূরে থাকলেও থেমে নেই তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন। বরং লেখালেখিকেই এখন নিজের অন্যতম সঙ্গী করে নিয়েছেন মিতা চট্টোপাধ্যায়। পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লেখার পাশাপাশি বই প্রকাশের ইচ্ছাও রয়েছে তাঁর। ২০০১ সালে কলকাতার ময়দানের বইমেলায় তাঁর লেখা ছোটদের দুটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর লেখা বই ১২৭টি স্কুলে সহায়ক বই হিসেবেও পড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। কেন অভিনয় থেকে সরে এলেন, সেই প্রশ্নে তাঁর সোজাসাপ্টা উত্তর ঈশ্বর যা দিয়েছেন, সেটাই যথেষ্ট। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্যও তাঁর বার্তা স্পষ্ট, কোনও শিক্ষাকেই অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ জীবনের কোনও শেখাই কখন কোথায় কাজে লেগে যায়, তা আগে থেকে বলা যায় না। তাই ৯৪ বছর বয়সেও রাত জেগে লেখেন, নতুন কিছু করার কথা ভাবেন এবং নিজের ছন্দে জীবনকে উপভোগ করেন ‘জন্মভূমি’র সেই চিরপরিচিত পিসিমা।






