‘তুমি এক্ষুনি বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে…’ অত্যন্ত আপন হওয়া সত্ত্বেও সুখেন দাসকে কেন এইভাবেই একদিন চুড়ান্ত অপমানের পর দুরদুর করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন? কী এমন আবদার করেছিলেন প্রিয় ‘ভাই’, যার জেরেই রেগে আ’গুন হয়ে উঠেছিলেন মহানায়িকা? পরে কেন সেই মানুষটির হাতেই মেয়ে মুনমুনের ভবিষ্যৎ তুলে দিয়েছিলেন তিনি?

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সুচিত্রা সেন শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী নন, তিনি নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও অভিনয় প্রতিভায় হয়ে উঠেছিলেন এক কিংবদন্তি। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করত, তেমনই ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংযত এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল। অভিনয়জীবনের শেষপর্বে তিনি যখন ধীরে ধীরে নিজেকে চলচ্চিত্রজগতের আড়ালে সরিয়ে নিচ্ছিলেন, তখন তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল নানা স্মরণীয় ঘটনা। তেমনই একটি ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে অভিনেতা ও পরিচালক সুখেন দাসের সঙ্গে।

শৈশব থেকেই সুচিত্রা সেনের সঙ্গে পরিচয় ছিল সুখেন দাসের। ছোট বয়সে তিনি স্টুডিওতে কাজ করার সময় সুচিত্রার সংস্পর্শে আসেন। সময়ের সঙ্গে সেই পরিচয় পারিবারিক স্নেহের সম্পর্কে পরিণত হয়। সুখেন দাস তাঁকে ‘দিদিভাই’ বলে ডাকতেন এবং সুচিত্রাও তাঁকে ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন বলে এই স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে সুখেন দাস অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনার কাজ শুরু করেন এবং সেই সম্পর্কও বজায় ছিল। নিজের পরিচালিত ‘মান অভিমান’ ছবিতে সুচিত্রা সেনকে অভিনয় করানোর ইচ্ছা থেকেই একদিন তাঁর বাড়িতে পৌঁছে যান সুখেন দাস। ছবিটি ১৯৭৮ সালে মুক্তি পায় এবং সুখেন দাসের পরিচালিত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলির মধ্যে এটি অন্যতম।

কিন্তু প্রিয় ‘দিদিভাইয়ের’ কাছে গিয়ে সুখেন দাস যে প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলেন, তা ছিল তাঁর কল্পনারও বাইরে। অভিনয়ের প্রস্তাব শুনেই সুচিত্রা সেন নাকি রেগে গিয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেন। কারণ সেই সময় সুচিত্রা সেন অভিনয়জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছিলেন এবং নিয়মিত ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন বলে দাবি করা হতো। ফলে সুখেন দাসের প্রস্তাবটি তাঁর সেই সিদ্ধান্তের বিপরীতে চলে গিয়েছিল। অত্যন্ত কষ্ট নিয়েই সেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। পরে অবশ্য নিজের প্রস্তাবের বিষয়টি ভেবে সুখেন দাসও বুঝতে পারেন, অভিনয় থেকে দূরে থাকতে চাওয়া সুচিত্রার কাছে এমন আবদার করা হয়তো ঠিক হয়নি।

তবে এই ঘটনার পরেই আসে গল্পের অন্য দিক। নিউ থিয়েটার্সের স্টুডিয়োয় সুখেন দাস ‘মান অভিমান’-এর শুটিং করছিলেন। আচমকাই সেখানে এসে হাজির হন সুচিত্রা সেন। আগে থেকে কোনও খবর না দিয়েই শুটিং ফ্লোরে এসে উপস্থিত হওয়ায় তাঁকে দেখে চমকে যান সুখেন দাস। সুচিত্রা তাঁর শুটিং দেখতে এসেছেন বলে জানান এবং বেশ কিছুক্ষণ সেখানে থাকেন। পরে তাঁকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানিয়ে বিদায় নেন। অর্থাৎ, বাড়ি থেকে রাগ করে বের করে দেওয়ার সেই ঘটনার পরেও সুখেন দাসের প্রতি তাঁর স্নেহ বা শুভকামনায় যে কোনও ঘাটতি ছিল না, এই ঘটনাই তার স্মৃতি হিসেবে উঠে আসে।

আরও পড়ুনঃ বদলাবে আবহাওয়া, ছাড় পাবেন না কেউ! পায়ে গুরুতর চো’টে ভেস্তে গিয়েছিল প্রথম দিনের এন্ট্রি! অবশেষে সব বাধা কাটিয়ে বিগ বস বাংলায় হতে চলেছে শন বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্র্যান্ড এন্ট্রি! চতুর্থ ওয়াইল্ড কার্ডে বড় চমক, কবে ঘরে ঢুকছেন অভিনেতা?

সুখেন দাসের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের সম্পর্কের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ও রয়েছে। পরবর্তীতে সুখেন দাসের পরিচালনায় ‘অমরকণ্টক’ ছবিতে অভিনয় করেন সুচিত্রা সেনের মেয়ে মুনমুন সেন। মেয়ের কাজের খবর শুনে সুচিত্রা সেন সুখেন দাসকে ফোন করে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। পুরো ঘটনাটি তাই শুধু একজন পরিচালকের সঙ্গে একজন মহানায়িকার পেশাগত সম্পর্কের গল্প নয়, বরং এর মধ্যে উঠে আসে দীর্ঘদিনের পরিচয়, অভিমান, রাগ এবং তার আড়ালে থাকা স্নেহের এক অন্যরকম সম্পর্ক। সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিত্বের এই মানবিক দিকটিই আজও তাঁর অনুরাগীদের কাছে আলাদা করে স্মরণীয়।

You cannot copy content of this page