দুর্গাপুজোর আগমনী আবহে বাঙালির মনে যে গানটি আজও বিশেষ জায়গা করে নেয়, সেটি হল ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’। মহালয়ার ভোরে আকাশবাণীর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠানে এই গান শুনলেই যেন পুজো এসে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। আর এই গানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী সুপ্রীতি ঘোষের নাম। ১৯২২ সালের ২৮ অগস্ট উত্তর কলকাতায় জন্ম হয়েছিল তাঁর। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল গভীর টান। মাত্র ১১ বছর বয়সে, ১৯৩৩ সালে বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি। এরপর ধীরে ধীরে নিজের সুরেলা কণ্ঠের জাদুতে শ্রোতাদের মন জয় করেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত, কীর্তন, আধুনিক বাংলা গান থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রের গান, বিভিন্ন ধারাতেই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ।
অথচ ২০২২ সালে তাঁর জন্মশতবর্ষ নীরবেই পেরিয়ে গিয়েছে। পুজোর কয়েকটি দিন ছাড়া বছরের বাকি সময়ে এই অসামান্য শিল্পীকে কতটা মনে রাখেন বাঙালি, সেই প্রশ্নও উঠে আসে। সুপ্রীতি ঘোষের সংগীতজীবনে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৩৬ সালে। সেই বছর সেনোলা কোম্পানি থেকে তাঁর প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। রেকর্ডের এক পিঠে ছিল কাব্যসঙ্গীত, অন্য পিঠে কীর্তন। এরপর ১৯৪১ সালে প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেন তিনি। ‘কে বলে যাও যাও, আমার যাওয়া তো নয় যাওয়া’ গানটির জন্য শান্তিনিকেতন থেকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুমতি ও আশীর্বাদ পেয়েছিলেন সুপ্রীতি। সেই বছরই প্রয়াত হন কবিগুরু। পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথের ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যে মায়ের কণ্ঠে গান গেয়েও বিশেষ পরিচিতি পান তিনি।
তবে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বহুগুণ বেড়ে যায় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠের পর তাঁর কণ্ঠে ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’ শুনে মুগ্ধ হয়েছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এই একটি গানই তাঁকে বাঙালির পুজোর আবেগের সঙ্গে এমনভাবে জুড়ে দিয়েছে যে, আজও তাঁর কণ্ঠ ছাড়া মহালয়ার ভোর যেন অনেকের কাছেই অসম্পূর্ণ। ১৯৪২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আবগারি পরিদর্শক অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সুপ্রীতি। বিয়ের পর হাজরা লেনের শ্বশুরবাড়িতে থাকতে শুরু করেন তিনি। স্বামীর সহযোগিতায় তাঁর সংগীতচর্চাও এগিয়ে চলে। সেই সময় তাঁদের পাড়াতেই থাকতেন অভিনেত্রী চন্দ্রাবতী দেবী।
বার্মা থেকে কলকাতায় এসে তরুণী সুপ্রিয়া দেবীও ওই এলাকায় ভাড়া থাকতেন। অভিনয়ের জগতে আসার আগে তিনি একদিন সুপ্রীতি ঘোষের কাছে গিয়ে সিনেমায় কাজের সুযোগ করে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। সুপ্রীতির নিজের জীবনেও ছিল এক বিশেষ স্বপ্ন। সেই সময়ের অনেক শিল্পী উপার্জনের টাকা দিয়ে সোনার গয়না তৈরি করলেও তিনি অর্থ জমাতেন নিজের বাড়ি তৈরির জন্য। সংগীতজীবনের উপার্জন থেকেই ধীরে ধীরে সেই স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি। গোলপার্কের কাছে কাকুলিয়া রোডে তৈরি হয় তাঁর তিনতলা বাড়ি। বাড়িটির শ্বেতপাথরের ফলকে আজও খোদাই করা রয়েছে তাঁর নাম। ২০০৯ সালে শিল্পীর মৃত্যুর পরেও বাড়িটি তাঁর স্মৃতি ও সংগীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
সুপ্রীতি ঘোষের একমাত্র মেয়ে চৈতী দেবীর জীবনেও জড়িয়ে রয়েছে সংগীতের নানা স্মৃতি। পাটনায় একটি অনুষ্ঠানে গান গাইতে গিয়ে মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল। সেখানে সুপ্রীতি ঘোষ, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস এবং দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীরা সংগীতানুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। যে পরিবারের বাড়িতে সুপ্রীতি ও সুচিত্রা মিত্রের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল, সেই পরিবারের সঙ্গেই গড়ে ওঠে ঘনিষ্ঠতা। পরবর্তী সময়ে সেই পরিবারের ছেলে আশিস চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিয়ে হয় চৈতীর। আশিস কর্পোরেট সংস্থায় কাজ করলেও লেখালিখি ও গানের কথা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে বেশ কিছু জনপ্রিয় বিজ্ঞাপনে অভিনয় করার পাশাপাশি ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘দহন’ ছবিতেও তাঁকে দেখা গিয়েছিল।
কয়েক বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, চৈতী দীর্ঘদিন নব নালন্দা স্কুলে ইংরেজির শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করেছেন। সুপ্রীতি বেঁচে থাকতেই চৈতী, তাঁর স্বামী এবং দুই সন্তানকে নিয়ে ওই বাড়ির তিনতলায় থাকতে শুরু করেন। সুপ্রীতি থাকতেন দোতলায়, আর একতলাটি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে ও পরিবারের সদস্যদের কাছে পেয়ে স্বস্তি পেয়েছিলেন শিল্পী। আজও সুপ্রীতি ঘোষের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে তাঁর ব্যবহার করা নানা জিনিস যত্ন করে রাখা রয়েছে। তাঁর নাতি কৌশিক এবং নাতবউ এখন দোতলার সেই ঘরেই থাকেন। ছোটবেলায় দিদিমার কাছেই হারমোনিয়াম বাজিয়ে ‘বাদল বাউল বাজায় রে’ গানটি শিখেছিলেন কৌশিক। দিদিমাকে তিনি ‘মাম’ বলে ডাকতেন। তাঁর কথায়, দিদিমার হাতের নিরামিষ রান্না ছিল অসাধারণ।
আরও পড়ুনঃ “১৫ বছর এত অ*ত্যাচার করেছেন, ভ্যানে চা-বিস্কুট খাওয়ানোটা ট্রেলার!” “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এমন দুর্গাপুজো, অনুষ্ঠান কোনদিনও দেখেনি!” দিল্লিতে মমতাকে আ’টক থেকে ইডেনের ড্রোন শো নিয়ে অকপট অঞ্জনা বসু! ‘এমনই সুন্দর যে দুর্গার কটা হাত সেটাই ওরা জানে না!’ ‘ঠিকই বাপের জন্মে দুর্গাপুজো দেখিনি, বাংলায় প্রথমবার মা আসছেন!’ ‘শহরটা মারোয়ারি বিয়েবাড়ি লাগছে’ কটাক্ষবিদ্ধ বিজেপি ঘনিষ্ঠ অভিনেত্রী!
কড়াইশুঁটির কচুরি, পোস্তর বড়া, ছোট ছোট লুচি থেকে শুরু করে বিজয়ার মালপোয়া এবং রসগোল্লার পায়েস, সবকিছুর স্বাদ আজও তাঁর মনে রয়েছে। বাড়িতে এখনও সুপ্রীতির আরাধ্য গিরিধারীর বিগ্রহ রয়েছে, যার নিত্যসেবা করতেন তিনি। অন্যদিকে, নাতনি শালিনী গুপ্তও দিদিমার সংগীতের উত্তরাধিকার বহন করছেন। ছোটবেলায় স্কুলের অনুষ্ঠানে ‘হে নূতন’ গানটি গাওয়ার জন্য দিদিমার কাছেই শিখেছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সুপ্রীতির গলার স্বর কিছুটা বদলে গেলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর পাশে থেকে গান গাইতেন শালিনী। মুম্বইয়ে থাকা শালিনীর কথায়, দিদিমার গাওয়া ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’ নির্দিষ্ট সুর ও স্কেলে ধরে রাখার চেষ্টা করেন তিনি। সম্প্রতি এক বন্ধুর কাছ থেকে ওই গানের কথা লেখা আঁচল-সহ একটি শাড়ি উপহার পেয়ে তাঁর মনে হয়েছিল, যেন দিদিমা আবার তাঁর কাছে ফিরে এসেছেন। কলকাতার বহু প্রখ্যাত শিল্পীর বাড়ি হারিয়ে গেলেও সুপ্রীতি ঘোষের উত্তরসূরিরা আজও তাঁর বাড়ি, স্মৃতি এবং সুরের ঐতিহ্য আগলে রেখেছেন।






