মহালয়ার ‘মহিষাসুরমর্দিনী’তে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জায়গায় হিন্দিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন যিনি, ‘নমো চণ্ডী’র সেই বাঙালি শিল্পীই আজ বিস্মৃতির আড়ালে! শতবর্ষ পেরিয়েও পাননি প্রাপ্য সম্মান, বরং শেষজীবনে পেয়েছেন অসীম কষ্ট! চেনেন এই কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী তথা ভাষ্যকারকে?

মহালয়ার ভোর মানেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী। দশকের পর দশক ধরে তাঁর কণ্ঠস্বরের সঙ্গেই বাঙালির দুর্গাপুজোর আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। তবে এই অনুষ্ঠানের ইতিহাসে এমন এক শিল্পী ছিলেন, যাঁর অবদান আজ অনেকটাই বিস্মৃত। তিনি সঙ্গীতশিল্পী আচার্য বিমলভূষণ। আকাশবাণীর প্রভাতী অনুষ্ঠান মহিষাসুরমর্দিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর কণ্ঠে ‘নমো চণ্ডী’ গানটি একসময় বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। শুধু গান নয়, হিন্দি সংস্করণের মহিষাসুরমর্দিনীতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন এই শিল্পী। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরেও প্রাপ্য সম্মান বা পরিচিতি সেভাবে পাননি বিমলভূষণ।

১৯২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর ১৩ হরিশ মুখার্জি রোডের বাড়িতে জন্ম বিমলভূষণের। তাঁর বাবা ছিলেন চিকিৎসক। ছোটবেলায়ই সঙ্গীতের জগতের বহু বিশিষ্ট মানুষের সংস্পর্শে আসেন তিনি। তাঁদের বাড়ির একতলায় থাকতেন চিত্রশিল্পী রসময় ভট্টাচার্য। সেই সময় তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসাবে সেখানে থাকতেন শচীন দেববর্মণও। কিশোর বয়সেই শচীন দেববর্মণের সঙ্গে বিমলভূষণের পরিচয় হয়। পরবর্তীকালে শচীন দেববর্মণ তাঁকে ‘জজসাহেবের নাতনি’ ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগও দেন। তবে শুধু চলচ্চিত্রের গান নয়, শাস্ত্রীয় এবং লঘুসঙ্গীত, দুই ক্ষেত্রেই নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন বিমলভূষণ।

১৯৩৭ সালে আকাশবাণীতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুমোদিত শিল্পী হন বিমলভূষণ। এর দু’বছর পর, ১৯৩৯ সাল থেকে মহিষাসুরমর্দিনীর সঙ্গে তাঁর যোগ তৈরি হয়। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি লঘুসঙ্গীতকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এমনকি আকাশবাণীকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন, তাঁকে যেন আর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সম্প্রচারে না রাখা হয়। আগ্রার মহম্মদ জান, যামিনী গঙ্গোপাধ্যায় এবং কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন তাঁর সঙ্গীতগুরুদের মধ্যে। নজরুলের লেখা কয়েকটি গানেও তরুণ বয়সে সুর দিয়েছিলেন তিনি। শ্যামাসঙ্গীতের ক্ষেত্রে নজরুলকে রামপ্রসাদ ও কমলাকান্তের থেকেও এগিয়ে রাখতেন বিমলভূষণ। মহিষাসুরমর্দিনী ছাড়াও রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং নজরুলগীতিতে প্লেব্যাক করেছেন তিনি, পাশাপাশি তাঁর সুরে ‘শ্রীরামের জন্মলীলা’ গীতিআলেখ্যও জনপ্রিয় হয়েছিল।

আরও পড়ুন: ‘দরজায় দরজায় ঘুরে বাংলা সিনেমা দেখতে বলতে হয়নি, লক্ষ লক্ষ দর্শক নিজেরাই হলে গিয়েছেন’, ‘বৌমা’ সিরিজ বানানোর কটা*ক্ষে সমালোচকদের জবাব দিলেন অঞ্জন-কন্যা রীনা চৌধুরী!

বিমলভূষণের কণ্ঠে ‘নমো চণ্ডী’ গানটির জনপ্রিয়তার পিছনেও রয়েছে একটি বিশেষ ঘটনা। তাঁর ছেলে ঊর্মিলেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কথায়, প্রথমদিকে গানটি পঙ্কজকুমার মল্লিক গাইতেন। পরে বিমলভূষণের কণ্ঠে গানটি নতুন পরিচিতি পায়। একবার তাঁদের পরিবারের আয়োজিত রামপ্রসাদের নাটকে বিমলভূষণ রামপ্রসাদের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। বিমলভূষণের অভিনয় দেখে তিনি এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন যে গানটির সুর বদলে রামপ্রসাদী সুরে গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সুরেই পরবর্তীকালে ‘নমো চণ্ডী’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাণীকুমার মহিষাসুরমর্দিনীর অন্যান্য গানের বিকল্প তৈরি করলেও এই গানটির কোনও বিকল্প রাখেননি, কারণ অনুষ্ঠানটির দ্বিতীয় পর্বের প্রথম গান হিসাবেই এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এরপর আসে মহিষাসুরমর্দিনীর হিন্দি সংস্করণের সঙ্গে বিমলভূষণের যোগ। আকাশবাণীর বি কে নন্দী তাঁকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জায়গায় হিন্দিতে ভাষ্যপাঠ করার প্রস্তাব দেন। প্রথমে বিমলভূষণ সেই দায়িত্ব নিতে চাননি।তাঁর বক্তব্য ছিল, তিনি গান করেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জায়গা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। শেষ পর্যন্ত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র নিজেই তাঁকে উৎসাহ দেন। তিনি বিমলভূষণকে জানিয়েছিলেন, হিন্দিতে তিনি কথা বলতে পারেন না, তাই এই দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে। এরপর থেকেই হিন্দি মহিষাসুরমর্দিনীর ভাষ্যপাঠ করেন বিমলভূষণ। আজও বাংলার বাইরে সেই হিন্দি সংস্করণ সম্প্রচারিত হয়, যদিও অনেকের ধারণা ছিল, সেখানে ভাষ্যপাঠ করেছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক।

বিমলভূষণের জীবনের শেষ পর্বও ছিল অনেকটাই আড়ালে। ১৯৯৬ সালে তিনি বেহালায় চলে আসেন এবং জীবনের শেষ দু’বছর সেখানেই কাটান। এই বাড়ির নাম ‘আদ্যালোক’, ফলকে লেখা রয়েছে ‘আচার্য্য বিমলভূষণ, সঙ্গীত-জ্যোতির্কোবিদ’। ১৯৯৮ সালে সিওপিডিতে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর দিন বেহালার বাড়িতে সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিও ছিল না। জীবিত অবস্থায় কোনও সরকারি পুরস্কার বা সম্মানও পাননি এই শিল্পী। ফলে মহিষাসুরমর্দিনী এবং ‘নমো চণ্ডী’র মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকেও শেষ পর্যন্ত অনেকটাই বিস্মৃতির আড়ালে চলে যান তিনি। শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও বিমলভূষণের প্রাপ্য মর্যাদা না পাওয়ার আক্ষেপ তাঁর পরিবারের মধ্যে এখনও রয়ে গিয়েছে।

You cannot copy content of this page