“মা দুর্গার কাছে নিজের মায়ের মতোই প্রার্থনা করি, বিজয়া এলেই খুব মনে পড়ে মায়ের কথা” স্মৃতিতে আবেগপ্রবণ মানালি দে! দশমীর বরণ থেকে সিঁদুর খেলা, মাকে হারানোর পরও আজও পুজো এলেই সেই দিনগুলিতে ফিরে যান অভিনেত্রী!

অভিনেত্রী মানালি দে-র কাছে দুর্গাপুজো মানেই পরিবার, বন্ধুবান্ধব আর খাওয়াদাওয়ার সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানো। বড় হয়ে গেলেও পুজো নিয়ে তাঁর সেই ঘরোয়া টান এখনও একই রকম রয়েছে। ছোটবেলায় সরকারি আবাসনে বড় হয়েছেন মানালি, যেখানে এখনও বেশ বড় করে পুজো হয়। পুজোর চারটে দিন সেখানে হইহুল্লোড়, আড্ডা আর খাওয়াদাওয়ার মধ্যেই কেটে যেত। বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ার পুজোয় আড্ডা দেওয়ার সেই দিনগুলিও তাঁর মনে এখনও স্পষ্ট। তবে পুজোর ভিড় বা রাত জেগে ঠাকুর দেখার প্রতি কোনওদিনই তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল না। বরং কাছের মানুষদের সঙ্গে ঘরোয়া অনুষ্ঠান এবং আড্ডাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ অভিনেত্রী।

ছোটবেলা থেকেই বেশ বাধ্য মেয়ে ছিলেন মানালি। পরিবারের শাসনের বাইরে গিয়ে খুব বেশি কিছু করার সুযোগ বা ইচ্ছা তাঁর ছিল না। তাই ছোটবেলায় খুব একটা বকাঝকাও খেতে হয়নি বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী। বড় হওয়ার পরেও সেই স্বভাবের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। রাত জাগা কিংবা নিয়মের বাইরে গিয়ে জীবন কাটানো তাঁর পছন্দ নয়। পুজোর সময় শহরের অতিরিক্ত ভিড়ও তাঁকে বিশেষ টানে না। এমনকি সারা রাত জেগে ঠাকুর দেখার অভিজ্ঞতাও তাঁর নেই। তাঁর কাছে পুজোর আনন্দ মূলত আপনজনদের সঙ্গে থাকা এবং একসঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যেই।

খুব অল্প বয়সেই অভিনয় জগতে পা রেখেছিলেন মানালি। ‘বউ কথা কও’ ধারাবাহিক যখন চলত, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। সেই সময় থেকেই পুজোর দিনগুলোতে মণ্ডপ উদ্বোধন কিংবা বিভিন্ন কাজের মধ্যে থাকতে হয়েছে তাঁকে। কখনও আবার কাজের ফাঁকে বাড়িতে ফিরে পরিবারের সঙ্গে আড্ডায় সময় কাটিয়েছেন। তাই ছোটবেলা থেকেই তাঁর পুজোর বেশিরভাগ সময়ই কাজের মধ্য দিয়ে কেটেছে। অভিনেত্রী হওয়ার আগে যেসব পুজোমণ্ডপে সাধারণ মানুষের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে ঠাকুর দেখতেন, পরে সেই জায়গাগুলিতেই তাঁকে উদ্বোধনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নিজের জীবনে পুজোকে ঘিরে এই পরিবর্তনটাকেও বেশ মজার বলে মনে করেন মানালি।

পুজোর কেনাকাটার ক্ষেত্রেও সময়ের সঙ্গে বদল এসেছে মানালির জীবনে। এখন সারা বছরই তাঁর পোশাক কেনা হয়ে যায় বলে পুজোর জন্য আলাদা করে নিজের জামাকাপড় কেনার প্রয়োজন হয় না। তাই বর্তমানে পুজোর কেনাকাটা বলতে মূলত পরিবারের সদস্য এবং কাছের মানুষদের জন্য উপহার কেনাই বোঝেন তিনি। তবে প্রতি বছর বাবা এবং স্বামীর কাছ থেকেও উপহার পান অভিনেত্রী। ছোটবেলায় অবশ্য পুজোর নতুন জামাকাপড়ের জন্য আলাদা করে অপেক্ষা থাকত। তখন সাধারণত ষষ্ঠীর দিন বাবা তাঁকে সঙ্গে নিয়ে পুজোর বাজারে বেরোতেন। সারা বছর পোশাক কেনার সুযোগ না থাকায় সেই দিনের কেনাকাটার আনন্দ ছিল আলাদা। তাই ষষ্ঠীর বাজারের সেই স্মৃতিও মানালির ছোটবেলার পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন: মহালয়ার ‘মহিষাসুরমর্দিনী’তে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জায়গায় হিন্দিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন যিনি, ‘নমো চণ্ডী’র সেই বাঙালি শিল্পীই আজ বিস্মৃতির আড়ালে! শতবর্ষ পেরিয়েও পাননি প্রাপ্য সম্মান, বরং শেষজীবনে পেয়েছেন অসীম কষ্ট! চেনেন এই কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী তথা ভাষ্যকারকে?

তবে মানালির কাছে বিজয়ার স্মৃতির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে রয়েছে তাঁর মা। ছোটবেলায় বিজয়ার দিন মায়ের সঙ্গে বই নিয়ে পুজোমণ্ডপে যেতেন অভিনেত্রী। প্রতিমার পায়ে সেই বই ছোঁয়ানোর রীতিও পালন করতেন তিনি। এরপর দেবীকে বরণ করার পালা শেষ হলে পাড়ার মহিলারা সিঁদুর খেলায় মেতে উঠতেন। ছোট্ট মানালিকেও তাঁরা আদর করে তিলক পরিয়ে দিতেন এবং সিঁদুরে রাঙিয়ে দিতেন। বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দৃশ্যগুলি এখনও তাঁর মনে খুব স্পষ্ট। বিজয়া এলেই মায়ের সঙ্গে কাটানো সেই আনন্দের দিনগুলির কথা ফিরে ফিরে মনে পড়ে তাঁর। সেই কারণেই পুজোর স্মৃতির মধ্যে বিজয়ার জায়গা তাঁর কাছে বিশেষ।

মায়ের সঙ্গে কাটানো সেই স্মৃতির কারণেই দেবী দুর্গার কাছেও নিজের মায়ের মতো করেই প্রার্থনা করেন মানালি। তাঁর চাওয়া, পুজোর সময়ে সবাই যেন ভালো থাকেন এবং সুস্থ থাকেন। অভিনেত্রীর বিশ্বাস, পরিবারের মানুষজন সুস্থ থাকলেই পুজোর আনন্দ সম্পূর্ণ হয়। তাই তাঁর কাছে দুর্গাপুজো শুধুমাত্র সাজসজ্জা, ঠাকুর দেখা বা উৎসবের সময় নয়। পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে থাকা এবং পুরনো সম্পর্ক ও স্মৃতিগুলিকে ফিরে দেখারও সময় এটি। ছোটবেলার সরকারি আবাসনের পুজো থেকে শুরু করে বর্তমানের ব্যস্ত কর্মজীবন, সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও পুজোকে ঘিরে তাঁর পারিবারিক টান বদলায়নি। আর বিজয়ার দিন মায়ের কথা মনে পড়ার সেই আবেগই আজও তাঁর পুজোর স্মৃতির অন্যতম বড় অংশ।

You cannot copy content of this page