টলিপাড়ার জনপ্রিয় অভিনেত্রী শকুন্তলা বড়ুয়ার অভিনয় জীবনের শুরুটাই ছিল বেশ চমকপ্রদ। বনেদি পরিবারের বধূ থেকে রুপোলি পর্দার অভিনেত্রী হয়ে ওঠা তাঁর কাছে সহজ ছিল না। সাতের দশকের শেষ দিকে ‘সুনয়নী’ ছবিতে মহানায়ক উত্তমকুমারের বিপরীতে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। প্রথম ছবিতেই উত্তমকুমারের বিপরীতে কাজ করা অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো হলেও শকুন্তলার জীবনে তা নিয়ে তৈরি হয়েছিল বড় সমস্যা। স্বামী তাঁকে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, উত্তমকুমারের সঙ্গে সিনেমায় অভিনয় করলে তাঁকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণে তাঁকে ‘অলক্ষ্মী’ হিসেবেও দেখার চেষ্টা হয়েছিল। শকুন্তলার কথায়, একজন স্ত্রীর পক্ষে স্বামীর মুখে এমন কথা শোনা অত্যন্ত অসম্মানের। তিনি কোনও অন্যায় করেননি, বরং নিজের প্যাশন গান এবং অভিনয়কেই বেছে নিয়েছিলেন। সেই সময়ের সমাজে বাড়ির বউয়ের বাইরের জগতে পা রাখা নিয়েও যে কত প্রশ্ন উঠত, তাঁর অভিজ্ঞতাই তার উদাহরণ।
শকুন্তলার মতে, লক্ষ্মী আর অলক্ষ্মীর এই ধারণা আসলে সমাজ তৈরি করেছে। তাঁর কথায়, মা-ঠাকুমাদের সময়েও মেয়েদের এই ধরনের নিয়মের মধ্যে থাকতে হত। তখন বাড়ির বউদের ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হত এবং লক্ষ্মী হয়েও সরস্বতী হওয়ার অধিকার ছিল না। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে এবং মেয়েরা পড়াশোনা করে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। পুরুষতন্ত্রের অনেক নিয়ম ভেঙে মেয়েরা এখন পুরুষদের করা নানা কাজও করছেন। তাই কোনও মেয়েকে অলক্ষ্মী বলার আগে সমাজকে ভাবতে হবে বলেই মনে করেন তিনি। শকুন্তলার বক্তব্য, আদিকাল থেকেই নিয়মের বোঝা মূলত মেয়েদের উপর চাপানো হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, স্বামী মারা গেলে মেয়েদের সাদা পোশাক পরতে হয়, কিন্তু কোনও পুরুষ বিপত্নীক হলে তাঁকে কেন একই নিয়ম মানতে হয় না। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেই কোনও মহিলা যে সংসারে ‘ঘরের লক্ষ্মী’, এমনটাও সব সময় সত্যি নয়।
নিজের জীবনের কথাও এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট করে বলেছেন শকুন্তলা। তাঁর দাবি, অভিনয় করে উপার্জন শুরু করার পরেই তাঁর প্রতি পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। যে মহিলাকে একসময় অভিনয়ের জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়েছিল, তাঁর উপার্জনের টাকাই পরে পরিবারের কাজে লাগতে শুরু করেছিল। শকুন্তলার কথায়, সমাজ এবং পরিবার দুটোই অনেক সময় সুবিধা অনুযায়ী নিজেদের ধারণা বদলে নেয়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যদি তাঁর অভিনয় করাই এতটা খারাপ হয়ে থাকে, তা হলে সেই অভিনয় থেকে আসা অর্থ পরিবারের লোকজন নিতেন কেন। তাঁর উপার্জন বাড়িতে আসার পরেই যেন সেই ‘অলক্ষ্মী’ মেয়েটিই ‘লক্ষ্মী’ হয়ে উঠেছিলেন। অভিনেত্রীর মতে, এই ঘটনা শুধু তাঁর একার নয়, বহু মেয়ের জীবনের সঙ্গেই এর মিল রয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতায়, আপনজনেরাও কখনও কখনও নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী সম্পর্ক এবং মূল্যবোধের হিসাব বদলে ফেলেন। সেই জায়গা থেকেই তিনি সমাজের এই দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এর পরেই বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ‘বিগ বস বাংলা’ নিয়ে সরব হন শকুন্তলা। তাঁর মতে, আগের তুলনায় সমাজ এখন অনেক বেশি উদার হয়েছে এবং লক্ষ্মী অলক্ষ্মীর ধারণাও কিছুটা কমেছে। তবে তাঁর অভিযোগ, এই উদারতার সুযোগে কিছু কমবয়সি মেয়েকে ‘বিগ বস’-এর ঘরে এমন কিছু করতে দেখা যাচ্ছে, যা তাঁর চোখে অত্যন্ত অশালীন। শকুন্তলা বলেছেন, ‘বিগ বস বাংলা’ দেখলেই বর্তমান সময়ের এই পরিবর্তন বোঝা যায়। তিনি দাবি করেছেন, বিগ বসের ঘরের ভিতরে অনেক ‘নোংরামি’ দেখছেন তিনি। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন, মেয়েরা সেখানে যা করছে বলে তিনি মনে করছেন, তার প্রতিবাদ তাঁদের বাবা-মায়েরা করছেন কি না। বরং তাঁর অভিযোগ, মেয়ের কাজকে সমর্থন করে অনেক বাবা-মা সাক্ষাৎকারে বলছেন, তাঁদের মেয়ে যা করেছে বেশ করেছে। তাঁর প্রশ্ন, এমন সমর্থনের কারণ কি শুধু মেয়ের মাধ্যমে টাকা এবং খ্যাতি আসছে বলেই। শকুন্তলার বক্তব্য, লক্ষ্মীলাভের আশায় পরিবারের মানুষ নিজেরাই যখন সব মেনে নেন, তখন বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
আরও পড়ুনঃ “তুই একটা মেয়েছেলে, পুরুষ হয়ে দেখা…” খাবার অপচয় থেকে আগ্রাসী আচরণ, নারী বিদ্বে’ষের অভিযোগ জিতুর বিরুদ্ধে! তবুও ‘দুষ্টুমি’ বলে সাত খু*ন মাফ করলেন দাদা? ‘রাজবীর মুখ খুললেই পাপ, তা এগুলো কি চোখে পড়ল না ‘বাংলার আইকন’ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের?’ ‘চোখে ঠুলি, কানে তুলো?’ খোঁচা বিগ বস দর্শকদের!
শকুন্তলার মতে, একসময় যে সমাজ মেয়েদের কাজ করা নিয়ে চরিত্রের প্রশ্ন তুলত, সেই সমাজই এখন অর্থ ও পরিচিতির সুবিধা দেখলে অনেক কিছু মেনে নিচ্ছে। তাঁর কথায়, মেয়েরা কাজ করতে বাইরে বেরোলেই তাঁদের চরিত্র নিয়ে বেশি কথা বলা হত। কিন্তু আজ মেয়েদের স্বাধীনতা অনেক বেড়েছে এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। তবু সেই পরিবর্তনের মধ্যেও অর্থ এবং পরিচিতির হিসাব কীভাবে মানুষের মূল্যবোধকে প্রভাবিত করছে, তা নিয়ে তাঁর প্রশ্ন রয়েছে। বিগ বস প্রসঙ্গে তিনি বিশেষ ভাবে বাবা-মায়েদের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, মেয়ের কাজের প্রতিবাদ না করে উল্টে প্রকাশ্যে সমর্থন করার পিছনে অনেক সময় পরিবারের নিজের স্বার্থও থাকতে পারে। শকুন্তলার ভাষায়, আপনজনদের মধ্যেও কখনও কখনও ‘কেনাবেচার সম্পর্ক’ তৈরি হয়ে যায়। অর্থাৎ সম্পর্কের জায়গাতেও সুবিধা এবং লাভের হিসাব ঢুকে পড়ে বলেই মনে করেন তিনি। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের রিয়্যালিটি শো, লক্ষ্মী অলক্ষ্মীর ধারণা এবং মেয়েদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই এ ভাবেই নিজের মত প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী।






