“এখানে পুজোআচ্চা হবে না”, স্বামী ও শাশুড়ির কড়া নিষেধাজ্ঞা! বিদেশি রীতিতে অভ্যস্ত, পুজো করলে নাকি ‘স্টেটাস’ নষ্ট হবে এমনই ছিল শ্বশুরবাড়ির ধারণা! বিয়ের পর কোনও পুজোর নামও নেওয়া যেত না! তবু হার মানেননি, কীভাবে সেই বাড়িতেই ৩৫ বছর আগে লক্ষ্মীপুজো শুরু করেছিলেন অনামিকা সাহা?

পর্দায় বহুবার দজ্জাল মা বা শাশুড়ির চরিত্রে দেখা গিয়েছে অভিনেত্রী অনামিকা সাহাকে। তবে বাস্তব জীবনে মা লক্ষ্মী তাঁর কাছে বরাবরই আরাধ্য। অভিনেত্রীর কথায়, জীবনের শুরুর দিকে ভাগ্য তাঁর সঙ্গে একেবারেই ছিল না। তবু মা লক্ষ্মীর প্রতি বিশ্বাস কখনও হারাননি তিনি। বিয়ের পর এমন এক পরিবারে গিয়েছিলেন, যেখানে পুজো-পার্বণের বিশেষ চল ছিল না। শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ ছিল অনেকটাই বিদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত। সেই বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো করার ইচ্ছা থাকলেও প্রথম দিকে তা প্রকাশ করার পরিস্থিতি ছিল না অনামিকার। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর বাপের বাড়িতে মা খুব ঘটা করে লক্ষ্মীপুজো করতেন। তাই বিয়ের সময়ও নিজের সঙ্গে লক্ষ্মীর একটি ছবি নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন তিনি।

অনামিকা জানিয়েছেন, বিয়ের পর নতুন বাড়িতে এসে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিদিন লক্ষ্মীর ছবিতে প্রসাদ দেওয়ার সুযোগও তাঁর থাকত না। লক্ষ্মীপুজোর দিন পুরোহিত আসা, আলপনা দেওয়া, ভোগ রান্না করা বা বাড়িতে উৎসবের পরিবেশ তৈরি করার রীতি ছিল না। শ্বশুর, শাশুড়ি এবং তাঁর স্বামী বিদেশি রীতিতে অভ্যস্ত থাকায় পুজো-পার্বণের প্রতি তাঁদের আগ্রহ ছিল কম। অভিনেত্রীর মনে হত, তিনি যেন সেই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছেন না। তাঁর কথায়, সেই বাড়িতে পুজো করা যেন স্টেটাসের সঙ্গে মানানসই নয় বলেই মনে করা হত। স্বামী বোধিসত্ত্ব মজুমদারও বিয়ের পর স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, তাঁদের বাড়িতে পুজোআচ্চার চল নেই। তাই কাউকে কিছু না বলে অনামিকা মনে মনে ঈশ্বরের কাছে শুধু জানতে চাইতেন, কোনও দিন তিনি নিজের মতো করে পুজো করতে পারবেন কি না। পাশাপাশি জীবিকার জন্য তাঁকে কঠিন পরিশ্রমও করে যেতে হয়েছিল।

অভিনেত্রীর জীবনে লড়াই শুধু সংসারেই সীমাবদ্ধ ছিল না, অভিনয় জগতেও তাঁকে বহু বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। অনামিকার কথায়, একটা সময় বড় সংবাদপত্রেও তাঁকে নিয়ে বিশেষ খবর প্রকাশিত হত না। বড় অভিনেত্রীদের পাশে গিয়ে বসলেও কখনও কখনও ফটোগ্রাফাররা তাঁকে সরে যেতে বলতেন। এই ঘটনায় তিনি একা একা কেঁদেছেন বলেও জানিয়েছেন অভিনেত্রী। তবে ধীরে ধীরে নিজের অভিনয়ের জায়গা তৈরি করে নেন তিনি। এরপর শ্বশুর ও শাশুড়ি মারা গেলে এবং স্বামী নিজের কাজ ও জগতে ব্যস্ত থাকায় অনামিকা নিজের মতো করে লক্ষ্মীর আরাধনা শুরু করেন। বাপের বাড়ি থেকে কোলে করে নিয়ে আসা সেই লক্ষ্মীর ছবিটিকেই তিনি বিশেষ জায়গায় প্রতিষ্ঠা করেন। শোওয়ার ঘরের মধ্যেই তৈরি করেন নিজের ঠাকুরঘর। সেই সময় আর স্বামীর তরফ থেকেও কোনও বাধা আসেনি বলে জানিয়েছেন তিনি।

অনামিকার দাবি, তাঁর বাড়িতে গত ৩৫ বছর ধরে নিয়মিত কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো হয়ে আসছে। এই পুজোর পুরো আয়োজনই তিনি নিজের উদ্যোগে করে আসছেন। এত বছর ধরে পুজোয় প্রায় ৫০ জন অতিথিকে ভোগ খাওয়ানোর ব্যবস্থাও করতেন অভিনেত্রী। তবে বয়স ও দায়িত্বের কারণে এ বার সেই আয়োজন কিছুটা ছোট করেছেন। তবু নিয়ম মেনে পুজো হচ্ছে এবং ভোগের আয়োজনও থাকছে। এ বার ভোগে রয়েছে লুচি, হালুয়া, ফুলকপির তরকারি এবং ছোলার ডাল। এর সঙ্গে নাড়ু, মিষ্টি, দই এবং বাতাসাও দেওয়া হচ্ছে। অভিনেত্রী জানিয়েছেন, এই সমস্ত প্রসাদ একটি গামলায় রাখা হয় এবং পরে ঘটে রাখা ডাবের জল দিয়ে তা মাখানো হয়। নিজের দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আজকের এই অবস্থাকে তিনি মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ বলেই মনে করেন।

আরও পড়ুনঃ অবশেষে এলো মেয়ে আরিয়ার ডাক, নাকি চ্যানেলের ‘নায়িকা’ সোনামণিকে বাঁচাতেই আউট করা হল ভরত কলকে? বিশেষ ক্ষমতা পেয়েই ফাইনাল পর্যন্ত নিরাপদ সোনামণি? সবটাই কাকতালীয় নাকি পরিকল্পিত? ক্ষু’ব্ধ বিগ বস বাংলার দর্শকরা, ফের উঠল স্বজনপোষনের অভিযোগ!

এখন অভিনয় জীবনের এই পর্যায়ে এসে মা লক্ষ্মীর কাছে নিজের আরও একটি ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন অনামিকা। তিনি চান, জীবনের শেষ দিকে এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করতে, যা দর্শকের মনে দীর্ঘদিনের জন্য দাগ কেটে থাকবে। চরিত্রটি নেতিবাচক না ইতিবাচক, তা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি চান, সেই চরিত্রের মাধ্যমে তাঁর পরিচয়ও নতুন করে তৈরি হোক। এক সময় তাঁর নাম ছিল ঊষা, পরে অভিনয়ের জগতে অনামিকা নামে পরিচিত হন, আর এখন দর্শকের কাছে তিনি বিন্দু মাসি নামেও পরিচিত। এ বার বিন্দু মাসির পরিচয় ছাপিয়ে নতুন কোনও চরিত্রের নামে দর্শক তাঁকে মনে রাখুক এবং ডাকুক, এটাই তাঁর ইচ্ছে। এত দিন কাউকে নিজের এই ইচ্ছার কথা জানাননি বলেও জানিয়েছেন অভিনেত্রী। লক্ষ্মীপুজোর দিন সেই কথাই প্রথম প্রকাশ্যে এল তাঁর মুখে। অবসর নেওয়ার ইচ্ছা তাঁর নেই, বরং মৃত্যুর দিন পর্যন্ত অভিনয় করে যেতে চান এবং সেই প্রার্থনাই মা লক্ষ্মীর কাছে করেছেন।

You cannot copy content of this page