বাংলা গানের জগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন গায়িকা লোপামুদ্রা মিত্র। তাঁর কণ্ঠে কখনও প্রতিবাদের সুর শোনা যায়, আবার কখনও সেই গানই হয়ে ওঠে আনন্দের প্রকাশ। গানের পাশাপাশি ব্যবসার দায়িত্বও সামলান তিনি। তাঁর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের জীবিকা নির্ভর করে সেই কাজের উপর। এত দায়িত্ব সামলেও নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করতে পছন্দ করেন শিল্পী। লক্ষ্মীপুজোর আবহে তাই উঠে এল লক্ষ্মী, নারী এবং সমাজে মেয়েদের অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন। সাধারণভাবে লক্ষ্মী বলতে অনেকেই শান্ত, নম্র ও বাধ্য মেয়েকে বুঝে থাকেন। কিন্তু লোপামুদ্রার কাছে লক্ষ্মী হওয়ার অর্থ একেবারেই আলাদা। তাঁর মতে, যিনি নিজের কাজ সুন্দরভাবে করতে পারেন, তিনিই লক্ষ্মী। সেই কাজের জন্য তাঁকে শান্ত বা চুপচাপ স্বভাবের হতে হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।
লক্ষ্মী বলতে সাধারণত ধনসম্পদের দেবীকে বোঝানো হয়। কিন্তু ‘লক্ষ্মী মেয়ে’ কথাটির সঙ্গে সমাজের দীর্ঘদিনের কিছু ধারণা জড়িয়ে রয়েছে। মেয়েরা শান্তভাবে কথা বলবেন, সকলের কথা মেনে চলবেন এবং কোনও বিষয়ে প্রতিবাদ করবেন না, এমন প্রত্যাশা বহুদিন ধরেই চলে আসছে। তবে লোপামুদ্রা মনে করেন, এখন আর লক্ষ্মী হওয়ার অর্থ শুধু নম্র ও বাধ্য থাকা নয়। যে কোনও মানুষ নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলেই তিনি লক্ষ্মী হতে পারেন। নিজের স্বভাবের কথা বলতে গিয়ে শিল্পী জানিয়েছেন, তিনি যদি এখন হঠাৎ খুব শান্ত ও বাধ্য হয়ে যান, তা হলে মানুষ তাঁকে পছন্দ করবেন কি না, তা নিয়েও তাঁর সন্দেহ রয়েছে। তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট, মেয়েদের ব্যক্তিত্বকে নির্দিষ্ট কিছু গুণের মধ্যে আটকে রাখার পক্ষপাতী নন তিনি।
লক্ষ্মীপুজোর মতো একটি ধর্মীয় উৎসবের আবহেও তাই নারীকে দেখার প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কর্মজীবন ও সংসার একসঙ্গে সামলানোর ক্ষেত্রে মেয়েদের উপর যে বাড়তি চাপ থাকে, সেই বিষয়েও নিজের মতামত জানিয়েছেন লোপামুদ্রা। তাঁর মতে, সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্ব বদলানো স্বাভাবিক। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখনও ততটা সহজ নয়। অনেক মহিলাকে বলতে শোনা যায়, তাঁদের কাজ করার অনুমতি রয়েছে কিংবা শ্বশুরবাড়িতে চাকরি করা নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। অথচ আর্থিক স্বাধীনতা কোনও অন্য মানুষের অনুমতি বা ছাড়পত্রের বিষয় হতে পারে না। এটি প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে, মেয়েরা বাইরে কাজ করুন বা নিজেদের কেরিয়ার গড়ে তুলুন, সংসারের সমস্ত দায়িত্বও তাঁদেরই সামলাতে হবে, এমন প্রত্যাশা থেকে যায়।
লোপামুদ্রার বক্তব্য, কোনও মহিলা নিজের কেরিয়ারে যথেষ্ট সফল হলেও সংসারের দায়িত্ব থেকে তিনি পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেন না। বাইরে থেকে তাঁর কাজের সাফল্য দেখা গেলেও ঘর সামলানোর দায় অনেক সময় নেপথ্যে থেকেই যায়। ফলে মেয়েদের জীবনে কাজ ও সংসারের ভারসাম্য বজায় রাখার লড়াই আজও শেষ হয়নি। বিয়ের পর সংসার দু’জন মানুষের হলেও ঘরের যাবতীয় দায়িত্ব মহিলার উপর বর্তানোর প্রবণতা এখনও রয়েছে বলে মনে করেন লোপামুদ্রা। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই অলিখিত নিয়মের কারণে অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের সংসারের কাজে অংশ নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয় না। শিল্পীর মতে, পুরুষেরা অনেক সময় মনে করেন, তাঁরা সংসারের জন্য যথেষ্ট কাজ করছেন। কিন্তু তাঁদের সেই ধারণার সঙ্গে বাস্তবের ফারাক থেকে যায়। ছোটবেলা থেকে তাঁরা পরিবারে কী দেখেছেন, কীভাবে বড় হয়েছেন এবং ঘরের কাজ সম্পর্কে কী শিখেছেন, তার প্রভাবও এই মানসিকতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার বিষয়ে সমস্যা এখনও রয়ে গিয়েছে। শুধু শিক্ষিত হওয়া বা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যমেই এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে না। সংসারকে দু’জনের সমান দায়িত্ব হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি হওয়াও জরুরি। লোপামুদ্রার কথায়, মেয়েরা নিজের পছন্দমতো জীবনযাপন করলেও ঘরের দায়িত্ব তাঁদের সামলাতেই হবে, এমন প্রত্যাশা এখনও সমাজে অনুভব করা যায়। নারী স্বাধীনতা এবং নারীবাদ নিয়ে বর্তমান সময়ে নানা আলোচনা হলেও বাস্তবে মেয়েরা কতটা স্বাধীনতা ও সম্মান পান, সেই প্রশ্নও তুলেছেন লোপামুদ্রা। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ও শিক্ষিত মহিলাদেরও সংসারকেন্দ্রিক নানা অসম্মানের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় এমন দায়িত্ব তাঁদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা একা তাঁদের বহন করার কথা নয়।
আরও পড়ুনঃ “আমার চলে যাওয়ায় ওদের অনেক প্রভাব পড়েছে” “কোনও আফসোস নেই, কখন যে কী হবে কেউ বুঝতে পারবে না” দু’মাসে কমেছে ৭ কেজি ওজন! বিগ বসের বাড়ি থেকে বেরিয়েই বি*স্ফোরক দাবি ভরত কলের? অন্দরের অভিজ্ঞতা নিয়ে কী বললেন? কাকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে চান তিনি?
এই প্রজন্মের মেয়েরা নিজেদের অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি কথা বলছেন। কিন্তু সেই আলোচনা বাস্তব জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সমাজ কি সত্যিই মেয়েদের প্রাপ্য সম্মান দিতে শিখেছে? এই প্রশ্নের উত্তরে লোপামুদ্রা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, না, সমাজ এখনও মেয়েদের যথাযথ স্বাধীনতা ও সম্মান দিতে শেখেনি। তাঁর কথায়, মেয়েদের কতটা স্বাধীনতা দেওয়া উচিত এবং তাঁরা কতটা সম্মান পাওয়ার যোগ্য, সেই বিষয়টিই সমাজ এখনও সঠিকভাবে বোঝে না। এই শিক্ষা সমাজে তৈরি করা হয়নি বলেই মনে করেন গায়িকা। লক্ষ্মীপুজোর আবহে তাঁর এই বক্তব্য তাই শুধু উৎসব বা দেবী আরাধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সংসারে নারীর অধিকার, স্বাধীনতা ও সম্মানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।






