“আমিই এখন দিদির অভিভাবক, বিপদে পড়লেই ও আবার খেতে শুরু করে…” “পুতুল থেকে সাজগোজ, সবকিছুর আবদার এখনও চলছে” ১১ বছর আগে স্বামী সুমিত সেনের মৃ’ত্যুতে ভেঙে পড়েছিলেন মালবিকা সেন, সেই থেকে তাঁকে কীভাবে আগলে রেখেছেন বোন শ্যামলিকা? দুই বোনের ভালোবাসা ও যত্নের অজানা গল্পে মন ভরবে আপনাদেরও!

জনপ্রিয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী মালবিকা সেন (Malabika Sen) বাংলা সংস্কৃতি জগতের পরিচিত মুখ। ভরতনাট্যম ও কুচিপুড়ি নৃত্যে তাঁর দক্ষতার পাশাপাশি অভিনয় ও সঙ্গীতের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত তিনি। তবে মঞ্চের বাইরেও তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তাঁর বোন শ্যামলিকার সঙ্গে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে দুই বোন নিজেদের ছোটবেলা, ঝগড়া, আবদার, পারিবারিক বন্ধন থেকে শুরু করে একে অপরের প্রতি যত্নের নানা অজানা গল্প তুলে ধরেছেন। তাঁদের কথাতেই স্পষ্ট, বোনের সম্পর্ক তাঁদের কাছে শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়, বরং বন্ধুত্ব ও অভিভাবকত্বেরও এক সুন্দর মেলবন্ধন।

মালবিকার ব্যক্তিগত জীবনেও এমন কিছু কঠিন অধ্যায় রয়েছে, যার প্রভাব তাঁর জীবনে গভীরভাবে পড়েছিল। তাঁর স্বামী সুমিত সেন ছিলেন পেশায় সাংবাদিক এবং মালবিকার থেকে প্রায় দশ বছরের বড়। সুমিত সেন ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র কলকাতা ব্যুরোর রেসিডেন্ট এডিটর হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছিলেন। প্রায় ১১ বছর আগে স্বামীকে হারানোর পর মালবিকা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সেই কঠিন সময় থেকে নিজেকে আবার সামলে নিয়ে দাঁড়াতে তাঁকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল নাচ। মালবিকার কাছে নাচ তাই শুধু শিল্পচর্চা বা নেশা নয়, জীবনের কঠিন সময়ে তা হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার ওষুধ। অভিনয়ের পাশাপাশি আজও নিজেকে নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচয় দিতেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।

ছোটবেলার স্মৃতি বলতে গিয়ে শ্যামলিকা জানান, তাঁরা ছোট থেকেই দুই বোনের পাশাপাশি একে অপরের খুব ভালো বন্ধু। ঝগড়া-ঝামেলা হলেও সেই সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসাটাই ছিল বেশি। মালবিকা মজা করে বলেন, তিনি নাকি ছোটবেলায় খুব শান্ত ছিলেন এবং বেশি মার খেতেন, অন্যদিকে শ্যামলিকার কিছুটা আবদার ও বায়না ছিল। তবে বড় হওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেছেন, দিদি হিসেবে শ্যামলিকা ছোটবেলা থেকেই অনেক কিছু ত্যাগ করেছেন। সেই পুরনো আবদার এখনও চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে বলেই জানান তিনি। অন্যদিকে শ্যামলিকাও জানান, ছোটবেলায় তাঁর পুতুল থেকে শুরু করে সাজগোজ, সবকিছুর সঙ্গী ছিলেন বোন। সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে, কিন্তু সেই বন্ধন বদলায়নি।

বর্তমানে দুই বোনের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে একই আবাসনে থাকার কারণে। তাঁরা দুজনেই ডায়মন্ড সিটি সাউথে একই কমপ্লেক্সে থাকেন। ফলে সুযোগ পেলেই দেখা হয়, কথা হয় এবং একে অপরের খোঁজখবরও রাখেন। শ্যামলিকা মজা করে জানান, তিনি এখন বোনের দিদি হওয়ার পাশাপাশি একরকম অভিভাবকের ভূমিকাও পালন করেন। কারণ মালবিকা নাকি খাবারদাবার নিয়ে ভীষণ নিয়ম মেনে চলেন এবং অনেক সময় খাবার এড়িয়ে ডায়েট করেন। ব্রেকফাস্ট সীমিত, লাঞ্চও অনেক সময় বাদ দিয়ে ফলের উপর থাকেন। এই নিয়ে বোনকে বকাঝকা করেন শ্যামলিকা। মালবিকাও হাসতে হাসতে জানান, বিপদে পড়লে তিনি আবার খেতে শুরু করেন, কিন্তু সমস্যা মিটলেই ফের ডায়েটে ফিরে যান।

সাক্ষাৎকারে উঠে আসে দুই বোনের ছোটবেলার আরও মজার একটি ঘটনা। শ্যামলিকা জানান, ছোটবেলায় প্রেম বা ছেলেদের ব্যাপারে তিনি নাকি ভীষণ ভীত ছিলেন। একবার তাঁর হাতে একটি লাভ লেটার আসে। যেখানে সাধারণত এমন চিঠি পেয়ে উত্তেজিত হওয়ার কথা, সেখানে শ্যামলিকা নাকি হাউহাউ করে কেঁদে সেই চিঠি মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। পুজোর সময়ও তাঁদের বাবা বোনকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য টাকা দিতেন। কিন্তু ঘুরতে বেরিয়েও শ্যামলিকার নজর থাকত বোন কী খাচ্ছে তার দিকে। ফুচকা বা আইসক্রিম খেতে বারণ করে বাড়ি ফিরে মায়ের রান্না খাওয়ার পরামর্শ দিতেন তিনি। এই স্মৃতিগুলিই আজ তাঁদের কাছে হাসির খোরাক হলেও, একইসঙ্গে দুই বোনের গভীর যত্নের ছবিটাও তুলে ধরে।

আরও পড়ুনঃ “আমি আ’ত্মহ*ত্যাপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলাম…” আবেগঘন কণ্ঠে জানালেন রূপম ইসলাম! ব্যাক্তিগত জীবন থেকে ইন্ডাস্ট্রি, নির্মম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বারবার? কী কারণে একসময় জীবনকে ঘিরে এমন চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন বাঙালি গায়ক?

দুই বোনের কথায় আরও স্পষ্ট হয়েছে, তাঁদের পরিবারের কাছে পরিবারই সবসময় প্রথম। ছোটবেলায় মা-বাবাকে পরিবারকে নিয়ে একসঙ্গে থাকতে দেখে তাঁরাও সেই মূল্যবোধ পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের সন্তানরাও পরিবারকে কেন্দ্র করে আনন্দ করতে ভালোবাসে বলে জানান তাঁরা। বন্ধুত্বের জায়গা যেমন রয়েছে, তেমনই প্রত্যেক সম্পর্কের নিজস্ব গুরুত্বও তাঁরা বজায় রাখেন। আর একে অপরের গোপন কথা? সেই প্রশ্নে হাসিতে ফেটে পড়েন দুই বোন। মালবিকা জানান, তিনি গোপন কথা রাখতে পারেন, কিন্তু শ্যামলিকা একটু বেশি কথা বলেন। সব মিলিয়ে তাঁদের কথোপকথনে উঠে এসেছে এমন এক বোনের সম্পর্ক, যেখানে ঝগড়া আছে, আবদার আছে, বকাঝকা আছে, আবার তার থেকেও অনেক বেশি রয়েছে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও একে অপরের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি।

You cannot copy content of this page