টালিগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর সদ্যপ্রাক্তন আপ্তসহায়ক সায়ন্তন সান্যালকে আর্থিক প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে খবর, পেশায় ঠিকাদার সায়ন্তনের বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার শ্যামনগরের ব্যানার্জিপাড়া রোডে। সোমবার ভোররাতে স্থানীয় থানার সহযোগিতায় সায়ন্তনকে তাঁর বাড়ি থেকেই গ্রেফতার করে বর্ধমান থানার পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, এক রেল ঠিকাদারের কাছ থেকে কয়েক দফায় টাকা ধার নিয়ে পরে তার একটি বড় অংশ ফেরত দেননি। অভিযোগের অঙ্ক প্রায় ১৯ লক্ষ টাকা বলে জানা গিয়েছে। গ্রেফতারের পর সোমবারই তাঁকে বর্ধমান সিজেএম আদালতে হাজির করানো হয়। ভারপ্রাপ্ত সিজেএম তাঁকে দু’দিনের পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এই ঘটনার পর স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কী ভাবে এই আর্থিক লেনদেনের ঘটনা সামনে এল এবং এর সঙ্গে আর কেউ যুক্ত কি না।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই মামলার অভিযোগকারী বিশ্বরূপ সাহা পূর্ব বর্ধমানের রায়না থানার সেহারাবাজারের বাসিন্দা। পেশায় তিনিও রেলের ঠিকাদার এবং ঠিকাদারি কাজের সূত্রেই তাঁর সঙ্গে সায়ন্তনের পরিচয় হয়েছিল। একই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে দু’জনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক লেনদেন চলত। বিশ্বরূপের কাছ থেকে মাঝেমধ্যেই টাকা ধার নিতেন সায়ন্তন এবং পরে তা ফেরতও দিতেন বলে জানা গিয়েছে। এই ভাবেই তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগকারীর বক্তব্য। কিন্তু গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কয়েক দফায় সায়ন্তন মোট ২৫ লক্ষ ৫৩ হাজার টাকা ধার নেন বলে অভিযোগ। পরে তাঁর স্ত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে বিশ্বরূপকে ৬ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছিল। বাকি ১৯ লক্ষ ৩ হাজার টাকা পরে মিটিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা আর ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
বিশ্বরূপের অভিযোগ, চলতি বছরের ১৭ মার্চ সায়ন্তন তাঁকে এসএমএস করে জানান যে তাঁর স্ত্রীর অ্যাকাউন্ট থেকে বিশ্বরূপের অ্যাকাউন্টে ৫ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেই টাকা তাঁর অ্যাকাউন্টে জমা পড়েনি বলে অভিযোগ করেন বিশ্বরূপ। এর পর বার বার টাকা ফেরত চাইলেও কোনও ফল হয়নি বলে তাঁর দাবি। নানা অছিলায় সায়ন্তন টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বর্ধমান সিজেএম আদালতের দ্বারস্থ হন বিশ্বরূপ। তাঁর আবেদনের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে তদন্তের জন্য বর্ধমান থানার আইসিকে নির্দেশ দেন বিচারক। সেই নির্দেশের পরেই তদন্তে নামে পুলিশ এবং সোমবার সায়ন্তনকে গ্রেফতার করা হয়। এখন এই আর্থিক লেনদেনের পুরো বিষয়টি এবং অভিযোগের সঙ্গে আর কেউ যুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
সায়ন্তনের গ্রেফতারির খবর সামনে আসার পর পাপিয়া অধিকারীর প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ্যে এসেছে। বিধায়কের দাবি, সায়ন্তনকে তিনি ইতিমধ্যেই কাজ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘ওকে পুজোর মধ্যেই আমি কাজ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলাম। আমাকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকে ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল।’’ তিনি আরও জানান, সেই সমস্ত অভিযোগের ভিত্তিতেই সায়ন্তনকে পিএ-র দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পাপিয়া বলেন, ‘‘আজ গ্রেফতার হয়েছে শুনলাম। কিন্তু ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে বেশ কিছু দিন।’’ অর্থাৎ গ্রেফতারির সময় সায়ন্তন আর তাঁর আপ্তসহায়ক ছিলেন না বলেই স্পষ্ট করেছেন বিধায়ক। তবে নির্বাচনের সময় থেকেই সায়ন্তন তাঁর সঙ্গে ছিলেন বলেও জানিয়েছেন পাপিয়া। তাঁর দাবি, সেই সময় তাঁর সঙ্গে থাকলেও তাঁর পিছনে সায়ন্তন কী করতেন, তা তাঁর পক্ষে সব সময় জানা সম্ভব ছিল না।
আরও পড়ুনঃ ‘আমি ১১-১২ বছর বয়সে থেকেই লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়ি না, কিছু অংশ এড়িয়ে চলি’ বাঙালি বাড়িতে ঘটা করে লক্ষ্মীপুজো হলেও কোন নিয়ম নিয়েই ছোটবেলা থেকে আপত্তি শ্রীলেখা মিত্রের? ‘পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলবে না’, সংসারের সুখ ও সমৃদ্ধির কামনার আড়ালে লুকিয়ে নারীর অপমান, কেন বললেন অভিনেত্রী?
পাপিয়া অধিকারী আরও বলেন, ‘‘নির্বাচনের সময় থেকেও ও সঙ্গে ছিল। কিন্তু আমার পিছনে কে কী করে বেড়ায়, আমার তো সবটা জানা নেই। অনেক অভিযোগ শুনেছি ওর বিরুদ্ধে।’’ বিধায়কের বক্তব্য অনুযায়ী, সায়ন্তনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তাঁর কাছে পৌঁছেছিল এবং সেই কারণেই তাঁকে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, সায়ন্তনের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক প্রতারণার অভিযোগের তদন্ত এখনও চলছে। পুলিশ জানতে চাইছে, অভিযোগ অনুযায়ী নেওয়া টাকার পুরো লেনদেন কী ভাবে হয়েছিল। এছাড়াও টাকা ফেরত দেওয়ার যে দাবি বা বার্তা দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তবতা কী ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনায় আর কোনও ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন কি না, তা নিয়েও তদন্তকারীরা তথ্য সংগ্রহ করছেন। আদালতের নির্দেশে আপাতত দু’দিনের পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন সায়ন্তন। তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে এই ঘটনায় আরও কী তথ্য সামনে আসে, এখন সেদিকেই নজর।






