ভারতীয় সঙ্গীতের জগতে লতা মঙ্গেশকরের নাম আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। দীর্ঘ কয়েক দশকের সঙ্গীতজীবনে তাঁর কণ্ঠে তৈরি হয়েছে অসংখ্য কালজয়ী গান। খ্যাতি থেকে সম্মান, পুরস্কার থেকে মানুষের ভালোবাসা, সবই পেয়েছিলেন তিনি। তবে সাফল্যে ভরা এই জীবনের আড়ালে ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম এবং কঠিন দায়িত্বের অধ্যায়। অল্প বয়সেই জীবনের নানা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। পরিবারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি গানকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে হয়েছিল। তাই জীবনের শেষ পর্যন্ত সাফল্যের পাশাপাশি সেই পুরনো দিনের লড়াইয়ের স্মৃতিও তাঁর সঙ্গে ছিল।
এক পুরনো সাক্ষাৎকারে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে পুনর্জন্ম নিয়ে কথা বলেছিলেন গীতিকার জাভেদ আখতার। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আবার জন্ম নেওয়ার সুযোগ পেলে লতা মঙ্গেশকর কী হতে চাইবেন। সেই প্রশ্নের উত্তরে গায়িকা এমন কথা বলেছিলেন, যা তাঁর জীবনের অন্য একটি দিক সামনে আনে। লতা জানিয়েছিলেন, সুযোগ থাকলে তিনি বরং আর জন্মাতেই চাইবেন না। আর যদি পুনর্জন্ম নিতেই হয়, তাহলে আর লতা মঙ্গেশকর হয়ে ফিরতে চান না তিনি। কারণ নিজের জীবনে কী কী কষ্ট এবং সমস্যা পেরোতে হয়েছে, তা সবচেয়ে ভালো জানতেন তিনিই। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, বাইরের মানুষের চোখে সাফল্যের জীবন যতটা সহজ মনে হয়, ভেতরের লড়াইটা ততটা সহজ ছিল না।
পুনর্জন্ম নিয়ে নিজের আরও একটি ইচ্ছার কথাও সেই আলাপচারিতায় জানিয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর। তিনি বলেছিলেন, আবার জন্ম হলে যেন খুব বড় বা বিলাসবহুল কোনও জায়গায় নয়, একটি ছোট বাড়িতে জন্ম নেন। শুধু তাই নয়, পরের জন্মে তিনি মেয়ে না হয়ে ছেলে হয়ে জন্মাতে চেয়েছিলেন। এর পিছনে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার কথাই উঠে আসে। খুব অল্প বয়স থেকেই পরিবারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের আর্থিক দায়িত্বও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ছোট বয়সেই গানকে পেশা করে উপার্জন করতে হয়েছিল তাঁকে, ফলে শৈশব থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই শুরু হয়েছিল।
লতা মঙ্গেশকরের জীবনের শুরুর দিনগুলির সংগ্রামের একটি ছবিও পাওয়া যায় তাঁর পুরনো কথাবার্তায়। তিনি জানিয়েছিলেন, সেই সময়ে অন্য শিল্পীরা যখন স্টুডিয়োয় যাওয়ার জন্য টাঙ্গা ব্যবহার করতেন, তখন অনেক সময় তাঁকে হেঁটে যেতে হত। যাতায়াতের সেই খরচটুকুও বাঁচিয়ে তিনি বাড়ির জন্য সবজি কিনে নিয়ে যেতেন। নিজের আরাম বা প্রয়োজনের চেয়ে পরিবারের চাহিদাকেই তখন বেশি গুরুত্ব দিতে হয়েছিল তাঁকে। পরবর্তী সময়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছলেও সেই অভাবের দিনগুলি তাঁর স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়ে এবং কয়েক দশক ধরে সঙ্গীতজগতে সক্রিয় থেকে তিনি তৈরি করেছিলেন বিশাল এক পরিচয়। তবে সেই পরিচয়ের সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশা এবং নিজের দায়িত্বও ক্রমশ বেড়েছিল।
আরও পড়ুনঃ “তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রূঢ় ভাবে বললেন, ‘বিহার থেকে এসেছেন নাকি?’ খুব গায়ে লেগেছিল!” “সেদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, একদিন গোটা পশ্চিমবঙ্গ আমায় চিনবে!” “৬৮৩ স্কয়্যার ফুটের ঘরে থাকি, রাজনীতি করে সম্পত্তি বাড়াইনি” আসানসোলের মেয়ে থেকে যাদবপুরের বিধায়ক, জীবনের লড়াইয়ের অজানা কাহিনি শোনালেন শর্বরী মুখোপাধ্যায়!
একটি গান কীভাবে গাওয়া হবে, শিল্পীর মর্যাদা কীভাবে বজায় থাকবে, এসব বিষয়েও লতা মঙ্গেশকের নিজস্ব ভাবনা ছিল। তাই পুনর্জন্ম নিয়ে তাঁর সেই বক্তব্যকে শুধু খ্যাতি থেকে দূরে থাকার ইচ্ছা হিসেবে দেখলে তাঁর কথার পুরো অর্থ ধরা পড়ে না। নিজের জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি যে কষ্ট, দায়িত্ব এবং সংগ্রামের কথা মনে রেখেছিলেন, সেটিই তাঁর উত্তরের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তিনি বুঝেছিলেন, ‘লতা মঙ্গেশকর’ নামটির সঙ্গে শুধু সম্মান আর জনপ্রিয়তা নয়, অনেক কঠিন অভিজ্ঞতাও জড়িয়ে রয়েছে। সেই কারণেই আবার জন্মানোর প্রসঙ্গে নিজের পরিচয় নিয়েও এমন ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন জীবন পেলে ছোট বাড়িতে জন্ম নেওয়া এবং ছেলে হয়ে জন্মানোই তাঁর পছন্দ হত। কোটি কোটি মানুষের কাছে সাফল্যের প্রতীক হয়ে থাকা সেই গায়িকার নিজের কথাতেই তাই তাঁর জীবনের আড়ালে থাকা সংগ্রামের একটি অন্য ছবি ধরা পড়ে।






