“তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রূঢ় ভাবে বললেন, ‘বিহার থেকে এসেছেন নাকি?’ খুব গায়ে লেগেছিল!” “সেদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, একদিন গোটা পশ্চিমবঙ্গ আমায় চিনবে!” “৬৮৩ স্কয়্যার ফুটের ঘরে থাকি, রাজনীতি করে সম্পত্তি বাড়াইনি” আসানসোলের মেয়ে থেকে যাদবপুরের বিধায়ক, জীবনের লড়াইয়ের অজানা কাহিনি শোনালেন শর্বরী মুখোপাধ্যায়!

টেলিভিশন, বড় পর্দা এবং মঞ্চ, তিন মাধ্যমেই দীর্ঘদিন ধরে অভিনয় করছেন শর্বরী মুখোপাধ্যায়। প্রায় তিন দশকের অভিনয় জীবনের পর ২০১২ সালে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। ২০২৬ সালে তিনি যাদবপুরের বিধায়ক হয়েছেন। তবে নতুন দায়িত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের ছন্দেও যে বড় বদল এসেছে, তা অকপটে জানিয়েছেন তিনি। আগের মতো নিয়ম করে কবিতা পড়া, গান শোনা কিংবা ধারাবাহিক দেখার সময় এখন আর পান না। এমনকী ব্যস্ততার কারণে ছেলেকে নিজের হাতে ভাত বেড়ে খাওয়ানোর সময়ও হচ্ছে না তাঁর। শর্বরীর কথায়, সকালে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, আর রাতে ফিরলে ছেলেও নিজের কাজে ব্যস্ত থাকে, ফলে ঠিক করে দেখা পর্যন্ত হয়ে ওঠে না। তবে সবকিছুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে নিজের নাটকের দল ‘নয়াবাদ তিতাস’-এর নতুন নাটকে অভিনয় করতে না পারায়। সময় করে মহড়া দিতে না পারলেও তিনি নাটকটির নেপথ্যে কাজ করেছেন এবং ঠিক করেছেন, রাজনীতির জন্য কোনওভাবেই থিয়েটার ছাড়বেন না।

আসানসোলের মেয়ে থেকে যাদবপুরের বিধায়ক হয়ে ওঠার পথটিও শর্বরীর কাছে নানা অভিজ্ঞতায় ভরা। ১৯৯৮ সালে প্রথম কলকাতায় আসার সময় তাঁর ছেলের বয়স ছিল মাত্র ছয় মাস। রবীন্দ্রসদনে যাওয়ার পথে রাস্তা চিনতে গিয়ে এক ব্যক্তির কাছে নন্দনের পথ জানতে চেয়েছিলেন তিনি। উত্তরে সেই ব্যক্তি তাঁকে রূঢ়ভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি বিহার থেকে এসেছেন কি না। ঘটনাটি তখন খুব খারাপ লেগেছিল শর্বরীর। সেই মুহূর্তেই তিনি মনে মনে ঠিক করেছিলেন, একদিন গোটা পশ্চিমবঙ্গ তাঁকে চিনবে। অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর পরে নেত্রী এবং এখন বিধায়িকা হিসেবেও মানুষ তাঁকে চিনছেন। তাই জীবনের পথে কী কী হারিয়েছেন, সেসব নিয়ে আলাদা করে হিসেব করতে চান না তিনি। শর্বরীর কথায়, “সেদিন রাস্তায় দাঁড়িয়েই ঠিক করেছিলাম, একদিন গোটা পশ্চিমবঙ্গ আমাকে চিনবে। আজ অভিনেত্রী হিসেবে মানুষ আমাকে চেনে, পরে নেত্রী হিসেবেও চিনেছে, আর এখন বিধায়িকা হিসেবেও চেনে। তাই কী হারালাম, সেই হিসেব করে আর বসে থাকি না।”

রাজনীতিতে ওঠাপড়া বা ব্যর্থতা কী ভাবে সামলান, সেই প্রশ্নেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন শর্বরী। তাঁর বক্তব্য, রাজনীতিতে আসার পিছনে ব্যক্তিগত কোনও পাওয়ার লক্ষ্য তাঁর নেই। ২০২৬ সালে বিধায়ক হওয়ার আগে ২০১২ সাল থেকে টানা দলের হয়ে কাজ করে গিয়েছেন তিনি। দল যে দায়িত্ব দিয়েছে, সেটাই করেছেন, আবার কোনও দায়িত্ব সরিয়ে নেওয়া হলেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানে বদল আসেনি। কারণ রাজনীতি থেকে নিজের জন্য কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা না থাকায় কোনও ওঠাপড়াকেই ব্যক্তিগতভাবে গায়ে মাখেন না তিনি। অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছাও তাঁর রয়েছে, তবে ধারাবাহিকে নয়। ধারাবাহিকে কাজ করার জন্য যে দীর্ঘ সময় দিতে হয়, বর্তমান ব্যস্ততার মধ্যে তা সম্ভব নয় বলেই জানিয়েছেন তিনি। তবে ওটিটি মাধ্যম এবং ভালো ছবিতে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে তাঁর। ইতিমধ্যেই টলিউডের কয়েকজন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন শর্বরী।

বিধায়ক হওয়ার পর নিজের জীবনযাত্রায় কোনও বড় পরিবর্তন আনতে চান না বলেও স্পষ্ট জানিয়েছেন শর্বরী। তিনি জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাড়ানোকে নিজের রাজনৈতিক জীবনের লক্ষ্য করবেন না। বর্তমানে তিনি ৬৮৩ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। সেখানে চারজন মানুষ একসঙ্গে ঢুকলে বসার ঘরে বসার জায়গাও ঠিকমতো থাকে না বলে জানিয়েছেন তিনি। তবু এই জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার ইচ্ছা তাঁর নেই। শর্বরীর কথায়, “বিধায়ক হওয়ার পর নিজের কাছে একটা প্রতিজ্ঞা করেছি, ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাড়াব না। আমি ৬৮৩ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটে থাকি, যেখানে চারজন একসঙ্গে এলে বসার ঘরেও জায়গা থাকে না। আমি চাই না এই অবস্থার কোনও পরিবর্তন হোক।” অভিনয়ের শিক্ষা যে রাজনীতির কাজেও তাঁকে সাহায্য করছে, সেটিও জানিয়েছেন তিনি। সময় মেনে চলা এবং কখন কী বলতে হবে, কী ভাবে বলতে হবে, এই অভ্যাস অভিনয়ের অনুশীলন থেকেই পেয়েছেন বলে তাঁর বক্তব্য। রাজনীতিতে সঠিক সময়ে সঠিক শব্দ বেছে বলার ক্ষেত্রেও সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগছে বলে জানিয়েছেন শর্বরী।

তাঁর কথা, সাজগোজ এবং ব্যক্তিগত উপস্থিতি নিয়ে অনেকে কটাক্ষ করলেও সেই মন্তব্য নিয়েও নিজের জবাব দিয়েছেন শর্বরী। তাঁকে নিয়ে নোংরা মন্তব্য করা মানুষদের উদ্দেশে তিনি জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে তাঁরা যেন তাঁর স্বাক্ষর নিতে আসেন। ব্যস্ত রাজনৈতিক জীবনের মধ্যেও নিজের যত্ন নেওয়ার নিয়মটিও বেশ নির্দিষ্ট তাঁর। সকাল সাড়ে নটা থেকে দশটার মধ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ঘুম থেকে উঠে স্নান, পুজো এবং তৈরি হওয়ার কাজ সেরে নেন। তারপর সারাদিন আয়নার সামনে দাঁড়ানোর মতো সময়ও থাকে না বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ত্বক বরাবরই ভালো এবং অনেকেই সেই কথা বলেছেন বলেও উল্লেখ করেছেন শর্বরী। এক সময়ের সহকর্মী বর্ষীয়ান অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তীর একটি কথাও এখনও মেনে চলেন তিনি। লিলিদি তাঁকে বলেছিলেন, “মনের মধ্যে কোনও কালি জমতে দিস না, তাহলে দেখবি বাইরে থেকেই এমনিই সুন্দর দেখাচ্ছে।” শর্বরী জানিয়েছেন, এই কথাটি তিনি এখনও মনে রাখেন এবং মেনে চলেন।

আরও পড়ুনঃ “নন্দিনীকে উস্কে নিজে সাধু সাজছে সবচেয়ে অমানবিক নিরঞ্জন, সৃজলা হাসপাতালে থাকতে বলেছিল নাটক করছে!” “ঘরে শাড়ি পরে আলু চপ সেজে ভিডিও করত, বিগ বসে না এলে বুঝতেই পারতাম না এত বড় সাই*কো!” সৌরভের মতো ব্যক্তিত্বের সঙ্গে গলাবাজি, অপমান! নিজের ভাবমূর্তি নষ্ট করে ফেলেছেন নিরঞ্জন, ক্ষু’ব্ধ দর্শক চাইছেন বিগ বস থেকে বেরিয়ে যাক?

টলিউডের দায়িত্ব পাওয়ার প্রসঙ্গেও নিজের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের কথা তুলে ধরেছেন শর্বরী। চারজন তারকা বিধায়ককে নিয়ে যে দায়িত্বের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে তিনি নেই কেন, তার নির্দিষ্ট উত্তর তাঁর কাছে নেই। তবে তাঁর দাবি, বহু বছর ধরে তিনি অভিনয় জগতের সঙ্গে যুক্ত এবং বিরোধী পরিসরে থেকেও নিজের নাটকের দলকে আগলে রেখেছেন। বিগত কয়েক বছর সরকারি হল না পেলেও দল এবং থিয়েটারের কাজ তিনি ছেড়ে দেননি। নিজেকে সহজে পিছিয়ে যাওয়ার মানুষ মনে করেন না শর্বরী। তাঁর কথায়, “টলিউডের কোনও দায়িত্ব যদি আমাকে দেওয়া হয়, আমি নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে কাজ করব। অপেক্ষা করছি, কাজ করে যাব। একদিন হয়তো দায়িত্ব দিতেই হবে, আর সেই দায়িত্ব পাওয়া আমার কাছে বড় আনন্দের হবে।” অন্যদিকে চারজন অভিনেতা বিধায়কের সঙ্গে নিজের কোনও প্রতিযোগিতা আছে কি না, সেই প্রশ্নও উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। শর্বরী জানিয়েছেন, প্রতিযোগিতার দৌড়ে তিনি বিশ্বাসী নন এবং প্রথম হওয়ার জন্য অন্যের সঙ্গে লড়াই করার প্রয়োজনও দেখেন না। তাঁর মতে, প্রথম হওয়া প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নয়, মেধা, পড়াশোনা এবং সঠিক সময়ে সঠিক প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারার উপর নির্ভর করে। তিনি আরও বলেন, “প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে যদি পড়াশোনাটাই না করি, তাহলে প্রথম হওয়ার স্বপ্ন কখনও পূরণ হবে না।”

You cannot copy content of this page